০২:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ ::
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সেই নেতারা এখন কে কোথায় নদীর নাম মালঞ্চ পেয়েছে সরকারি স্বীকৃতি কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ‘ডিজিটাল ইভটিজিং’ ইস্যুতে আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে তোলপাড় আমার মুর্শিদ হযরত মাওলানা শাহসুফী ফরিদপুরী (কুঃ ছেঃ আঃ) ভাঙ্গায় পিকআপ-পরিবহন মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ৩০ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করছে তেলবাহী তিনটি সুপার ট্যাংকার ইরানে-যুক্তরাষ্ট্র শাস্তি আলোচনা সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হলো পিংকের দখল নিয়ে ডিভোর্সী দম্পতির দ্বন্দ্ব, মাথা ফাটলো কর্মচারীর ইসরায়েলের বোমা হামলায় লেবাননে নিহত দিপালির পরিবার শোকে বাকরুদ্ধ চাঁদের পরিবেশ রেকি করে পৃথিবীতে ফিরলেন ৪ নভোচারী

আধুনিক ফরিদপুরের স্বাস্থ্য বিপ্লবের অগ্রদূত ডা. মোহাম্মদ জাহেদ

হারুন আনসারী
  • আপডেট সময় : ১০:০৬:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬
  • / 207

১৯৮০ সালে হাসান নামে চার বছরের একটি শিশু কৃমির ওষুধের অভাবে অন্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনা ভীষণভাবে নাড়া দেয় ফরিদপুরের তৎকালীন গরিবের ডাক্তার ডা. মোহাম্মদ জাহেদকে। কিছু একটা করার মানসে তিনি তখন ফরিদপুরের সমাজহিতৈষী ব্যক্তিদের নিয়ে ওই বছরের ২ মার্চ “রেডক্রস সানডে ফ্রি ক্লিনিক” নামে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। এরপর এই প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় ১৯৮১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর  শিশু চিকিৎসা কেন্দ্রের একটি নিজস্ব শিশু ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ১৯৮২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সামরিক শাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এর উদ্বোধন করেন।  এটিই বর্তমানে ডা. জাহেদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতাল।

যতোটা সহজভাবে উপরের তথ্যগুলো বলা গেলো এক নিঃশ্বাসে, বাস্তবতা ততোটাই বন্ধুর ছিলো এই পথচলা। বড় সমস্যা ছিলো জায়গা ও স্থাপনা নির্মাণের জন্য অর্থ। সেসময় এই হাসপাতাল তৈরির জন্য আটরশীর পীর সাহেব নামে পরিচিত খাজা ফরিদপুরী (রহ.) শিশু হাসপাতালের ভবন নির্মাণের জন্য ২০ হাজার টাকা দান করেন।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ডা. মোহাম্মদ জাহেদের হাত ধরে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল ছাড়াও ডা. জাহেদ তাঁর সহযোগীদের নিয়ে তৈরি করে গেছেন আরো যুগান্তকারী কিছু স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান। যা আজ ফরিদপুরের বুকে একেকটি মহিরুহ হয়ে দাড়িয়ে রয়েছে।

শিশু হাসপাতালের আগে ১৯৮০ সালের ২১ অক্টোবর বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতি ফরিদপুর জেলা শাখা প্রতিষ্ঠা করেন। যখন রাতকাণা কিংবা সামান্য ছানি পড়ে চোখ অন্ধ হয়ে যাওয়ার চিকিৎসাও মিলতো না। ছিলোনা এতো হাসপাতাল।

সম্ভবত, একজন চিকিৎসক হিসেবে সমাজের মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ তিনি আত্মস্থ করেছিলেন তাঁরই মেডিক্যাল কলেজর শিক্ষাগুরু ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের সাহচর্যে। সেই সময়েও উন্নয়নশীল দেশে ডায়াবেটিস রোগ একটি নিরব ঘাতক হয়ে উঠেছিণ এবং এর মোকাবেলায় যে সমন্বিত প্রচেষ্টার দরকার, সেকথা বহুবছর আগেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম।

১৯৫৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন Diabetic Association of Pakistan, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর Diabetic Association of Bangladesh নামে পরিচিতি লাভ করে। এই সংগঠন কেবল একটি চিকিৎসা কেন্দ্র নয়, বরং একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে কাজ শুরু করে। এর উদ্দেশ্য ছিল ডায়াবেটিস সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা, রোগ নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা তৈরি, এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুলভ চিকিৎসা নিশ্চিত করা। স্বেচ্ছাসেবক, রোগী ও তাদের পরিবার, চিকিৎসক, খাদ্য বিশেষজ্ঞ এবং সমাজকর্মীদের সমন্বয়ে এই অ্যাসোসিয়েশন ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ডায়াবেটিক সমিতির হসপিটাল।

এরপর ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ইন ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রাইন অ্যান্ড মেটাবলিক ডিসঅর্ডারস সংক্ষেপে বারডেম (BIRDEM)। জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন এবং বিআইআরডিইএমের মাধ্যমে গড়ে ওঠা ‘বাংলাদেশ মডেল’ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ (WHO) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই উদ্যোগকে প্রশংসা করেছে।

এদিকে, মহৎপ্রাণ ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম যেনো পরশপাথর হয়ে তার কর্মের দীপ্তি ছড়িয়ে দেন সারা দেশময়। তাঁরই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরই সুযোগ্য ছাত্র ফরিদপুরের আরেক মহৎপ্রাণ ব্যক্তিত্ব ডা. মোহাম্মদ জাহেদ কতিপয় মহৎপ্রাণ সমাজসেবকদের সাথে নিয়ে ১৯৮৩ সালের ২৫ নভেম্বর প্রতিষ্ঠা করেন ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতি।

ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের আরেক সুযোগ্য ছাত্র ডা. আব্দুস সালাম চৌধুরী হন সভাপতি আর ডা. মোহাম্মদ জাহেদ সাধারণ সম্পাদকের দ্বায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক সৈয়দ সোলায়মান ঝিলটুলীতে একটি পুরাতন দ্বিতল ভবনের দোতলা এই সমিতিকে বন্দোবস্ত দেন। সেবছর থেকে এখানে ডায়াবেটিক রোগ পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকাস্থ বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির এফিলিয়েশন প্রাপ্ত হয়| ১৯৮৬ সালের ২৪ জানুয়ারী প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী মেজর জেনারেল মহব্বতজান চৌধুরী এর উদ্বোধন করেছিলেন।

সেদিন বিন্দু থেকে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি আজ ৫শ’ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ ও নার্সিং ইন্সটিটিউটে বিস্তার পেয়েছে| ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতি ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে| ২০১০ সালে ফরিদপুর ডায়বেটিক অ্যাসোসেয়েশন মেডিক্যাল কলেজ উদ্বোধন করা হয়। ১ম থেকে ১০ম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে এমবিবিএস পাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে ১৬ তম ব্যাচে ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়েছে। ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন নার্সিং ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা-ইন-নার্সিং সায়েন্স ও মিডওয়াইফারি কোর্সে প্রতি ব্যাচে ৫০ জন শিক্ষার্থী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিচ্ছে| এবছর ১৯তম ব্যাচে ভর্তি করা হয়েছে।

শহরের উপকন্ঠে ডোমরাকান্দিতে এক একর ৭৯ শতাংশ জমিতে ডায়বেটিক সমিতির কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের কাজ চলছে। জেলা শহরের বাইরে আলফাডাঙ্গায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সাদ্দাম মেমোরিয়াল ডায়াবেটিক অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল। প্রতিবছর ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা ক্যাম্প ও চিকিৎসা বিষয়ক বৈজ্ঞানিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়|

সহযাত্রী ছিলেন যারা

ডা. মোহাম্মদ জাহেদ কেবল একটি হাসপাতাল তৈরি করেননি, তিনি ফরিদপুরকে দিয়েছেন একটি আত্মনির্ভরশীল স্বাস্থ্য কাঠামো। তাঁর রোপণ করা সেই চারাগাছগুলো আজ বিশাল মহীরুহ হয়ে কোটি মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এই মহৎ যাত্রায় সাথে থেকে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন আরো কতপিয় মহৎপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন অধ্যাপক শেখ আব্দুস সামাদ, ডা. আব্দুস সালাম চৌধুরী, অধ্যাপক এমএ সামাদ, ডা. ননী গোপাল সাহা, ডা. আব্দুর রাজ্জাক,  রকিবউদ্দিন আহমেদ, শাহজাহান মোল্লা,  অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ সাহা, কামরুজ্জামান খান জাসু সহ আরও কতিপয় নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবী।

ফরিদপুরের প্রতিটি ধূলিকণায় ডা. জাহেদের সেবার ঘ্রাণ মিশে আছে। তিনি কেবল একজন চিকিৎসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সমাজসংস্কারক। তাঁর হাত ধরে শুরু হওয়া এই আন্দোলন আজ কোটি মানুষের নির্ভরতার প্রতীক।

এক নজরে ডা. মোহাম্মদ জাহেদের বৃত্তান্ত

ডা. মোহাম্মদ জাহেদ ১৯২৮ সালের ১ মার্চ ফরিদপুরের বিল মামুদপুরে জন্মগ্রহণ করেন| ফরিদপুর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ১৯৪৮ সালে ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। তখন ক্যাম্পাসে বাংলা নাটক নিষিদ্ধ ছিলো। তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করে সেখানে নাটক মঞ্চায়ন শুরু করেন। এভাবেই ভাষা আন্দোলনে তার অংশগ্রহণ। তিনি ৫২-৫৩ সালে ঢামেকের ছাত্রছাত্রী সংসদের ভিপি হয়েছিলেন।

১৯৫৮ সালে এমবিবিএস পাশ করে যোগ দেন চুয়াডাঙ্গা মহকুমা মেডিক্যাল অফিসার পদে। দু’বছর পরে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে ফিরে আসেন ফরিদপুর। শুরু করেন চেম্বার নিয়ে প্রাইভেট প্রাকটিস। দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সেবায় বিনামূল্যে প্রাপ্ত স্যাম্পলগুলো তাদের দিতেন।

শেয়ার করুন

আধুনিক ফরিদপুরের স্বাস্থ্য বিপ্লবের অগ্রদূত ডা. মোহাম্মদ জাহেদ

আপডেট সময় : ১০:০৬:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬

১৯৮০ সালে হাসান নামে চার বছরের একটি শিশু কৃমির ওষুধের অভাবে অন্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনা ভীষণভাবে নাড়া দেয় ফরিদপুরের তৎকালীন গরিবের ডাক্তার ডা. মোহাম্মদ জাহেদকে। কিছু একটা করার মানসে তিনি তখন ফরিদপুরের সমাজহিতৈষী ব্যক্তিদের নিয়ে ওই বছরের ২ মার্চ “রেডক্রস সানডে ফ্রি ক্লিনিক” নামে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। এরপর এই প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় ১৯৮১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর  শিশু চিকিৎসা কেন্দ্রের একটি নিজস্ব শিশু ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ১৯৮২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সামরিক শাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এর উদ্বোধন করেন।  এটিই বর্তমানে ডা. জাহেদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতাল।

যতোটা সহজভাবে উপরের তথ্যগুলো বলা গেলো এক নিঃশ্বাসে, বাস্তবতা ততোটাই বন্ধুর ছিলো এই পথচলা। বড় সমস্যা ছিলো জায়গা ও স্থাপনা নির্মাণের জন্য অর্থ। সেসময় এই হাসপাতাল তৈরির জন্য আটরশীর পীর সাহেব নামে পরিচিত খাজা ফরিদপুরী (রহ.) শিশু হাসপাতালের ভবন নির্মাণের জন্য ২০ হাজার টাকা দান করেন।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ডা. মোহাম্মদ জাহেদের হাত ধরে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল ছাড়াও ডা. জাহেদ তাঁর সহযোগীদের নিয়ে তৈরি করে গেছেন আরো যুগান্তকারী কিছু স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান। যা আজ ফরিদপুরের বুকে একেকটি মহিরুহ হয়ে দাড়িয়ে রয়েছে।

শিশু হাসপাতালের আগে ১৯৮০ সালের ২১ অক্টোবর বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতি ফরিদপুর জেলা শাখা প্রতিষ্ঠা করেন। যখন রাতকাণা কিংবা সামান্য ছানি পড়ে চোখ অন্ধ হয়ে যাওয়ার চিকিৎসাও মিলতো না। ছিলোনা এতো হাসপাতাল।

সম্ভবত, একজন চিকিৎসক হিসেবে সমাজের মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ তিনি আত্মস্থ করেছিলেন তাঁরই মেডিক্যাল কলেজর শিক্ষাগুরু ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের সাহচর্যে। সেই সময়েও উন্নয়নশীল দেশে ডায়াবেটিস রোগ একটি নিরব ঘাতক হয়ে উঠেছিণ এবং এর মোকাবেলায় যে সমন্বিত প্রচেষ্টার দরকার, সেকথা বহুবছর আগেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম।

১৯৫৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন Diabetic Association of Pakistan, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর Diabetic Association of Bangladesh নামে পরিচিতি লাভ করে। এই সংগঠন কেবল একটি চিকিৎসা কেন্দ্র নয়, বরং একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে কাজ শুরু করে। এর উদ্দেশ্য ছিল ডায়াবেটিস সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা, রোগ নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা তৈরি, এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুলভ চিকিৎসা নিশ্চিত করা। স্বেচ্ছাসেবক, রোগী ও তাদের পরিবার, চিকিৎসক, খাদ্য বিশেষজ্ঞ এবং সমাজকর্মীদের সমন্বয়ে এই অ্যাসোসিয়েশন ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ডায়াবেটিক সমিতির হসপিটাল।

এরপর ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ইন ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রাইন অ্যান্ড মেটাবলিক ডিসঅর্ডারস সংক্ষেপে বারডেম (BIRDEM)। জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন এবং বিআইআরডিইএমের মাধ্যমে গড়ে ওঠা ‘বাংলাদেশ মডেল’ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ (WHO) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই উদ্যোগকে প্রশংসা করেছে।

এদিকে, মহৎপ্রাণ ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম যেনো পরশপাথর হয়ে তার কর্মের দীপ্তি ছড়িয়ে দেন সারা দেশময়। তাঁরই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরই সুযোগ্য ছাত্র ফরিদপুরের আরেক মহৎপ্রাণ ব্যক্তিত্ব ডা. মোহাম্মদ জাহেদ কতিপয় মহৎপ্রাণ সমাজসেবকদের সাথে নিয়ে ১৯৮৩ সালের ২৫ নভেম্বর প্রতিষ্ঠা করেন ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতি।

ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের আরেক সুযোগ্য ছাত্র ডা. আব্দুস সালাম চৌধুরী হন সভাপতি আর ডা. মোহাম্মদ জাহেদ সাধারণ সম্পাদকের দ্বায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক সৈয়দ সোলায়মান ঝিলটুলীতে একটি পুরাতন দ্বিতল ভবনের দোতলা এই সমিতিকে বন্দোবস্ত দেন। সেবছর থেকে এখানে ডায়াবেটিক রোগ পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকাস্থ বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির এফিলিয়েশন প্রাপ্ত হয়| ১৯৮৬ সালের ২৪ জানুয়ারী প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী মেজর জেনারেল মহব্বতজান চৌধুরী এর উদ্বোধন করেছিলেন।

সেদিন বিন্দু থেকে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি আজ ৫শ’ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ ও নার্সিং ইন্সটিটিউটে বিস্তার পেয়েছে| ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতি ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে| ২০১০ সালে ফরিদপুর ডায়বেটিক অ্যাসোসেয়েশন মেডিক্যাল কলেজ উদ্বোধন করা হয়। ১ম থেকে ১০ম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে এমবিবিএস পাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে ১৬ তম ব্যাচে ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়েছে। ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন নার্সিং ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা-ইন-নার্সিং সায়েন্স ও মিডওয়াইফারি কোর্সে প্রতি ব্যাচে ৫০ জন শিক্ষার্থী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিচ্ছে| এবছর ১৯তম ব্যাচে ভর্তি করা হয়েছে।

শহরের উপকন্ঠে ডোমরাকান্দিতে এক একর ৭৯ শতাংশ জমিতে ডায়বেটিক সমিতির কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের কাজ চলছে। জেলা শহরের বাইরে আলফাডাঙ্গায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সাদ্দাম মেমোরিয়াল ডায়াবেটিক অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল। প্রতিবছর ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা ক্যাম্প ও চিকিৎসা বিষয়ক বৈজ্ঞানিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়|

সহযাত্রী ছিলেন যারা

ডা. মোহাম্মদ জাহেদ কেবল একটি হাসপাতাল তৈরি করেননি, তিনি ফরিদপুরকে দিয়েছেন একটি আত্মনির্ভরশীল স্বাস্থ্য কাঠামো। তাঁর রোপণ করা সেই চারাগাছগুলো আজ বিশাল মহীরুহ হয়ে কোটি মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এই মহৎ যাত্রায় সাথে থেকে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন আরো কতপিয় মহৎপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন অধ্যাপক শেখ আব্দুস সামাদ, ডা. আব্দুস সালাম চৌধুরী, অধ্যাপক এমএ সামাদ, ডা. ননী গোপাল সাহা, ডা. আব্দুর রাজ্জাক,  রকিবউদ্দিন আহমেদ, শাহজাহান মোল্লা,  অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ সাহা, কামরুজ্জামান খান জাসু সহ আরও কতিপয় নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবী।

ফরিদপুরের প্রতিটি ধূলিকণায় ডা. জাহেদের সেবার ঘ্রাণ মিশে আছে। তিনি কেবল একজন চিকিৎসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সমাজসংস্কারক। তাঁর হাত ধরে শুরু হওয়া এই আন্দোলন আজ কোটি মানুষের নির্ভরতার প্রতীক।

এক নজরে ডা. মোহাম্মদ জাহেদের বৃত্তান্ত

ডা. মোহাম্মদ জাহেদ ১৯২৮ সালের ১ মার্চ ফরিদপুরের বিল মামুদপুরে জন্মগ্রহণ করেন| ফরিদপুর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ১৯৪৮ সালে ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। তখন ক্যাম্পাসে বাংলা নাটক নিষিদ্ধ ছিলো। তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করে সেখানে নাটক মঞ্চায়ন শুরু করেন। এভাবেই ভাষা আন্দোলনে তার অংশগ্রহণ। তিনি ৫২-৫৩ সালে ঢামেকের ছাত্রছাত্রী সংসদের ভিপি হয়েছিলেন।

১৯৫৮ সালে এমবিবিএস পাশ করে যোগ দেন চুয়াডাঙ্গা মহকুমা মেডিক্যাল অফিসার পদে। দু’বছর পরে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে ফিরে আসেন ফরিদপুর। শুরু করেন চেম্বার নিয়ে প্রাইভেট প্রাকটিস। দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সেবায় বিনামূল্যে প্রাপ্ত স্যাম্পলগুলো তাদের দিতেন।