মুসলমান শাসকরাই বাংলা ভাষায় প্রথম রোমান্টিক সাহিত্যের প্রচলন করেন।
সংস্কৃতের বেষ্টনী ভেঙে বাংলা সাহিত্যের বিকাশ : পর্যালোচনা
- আপডেট সময় : ১০:০১:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
- / 188
“এই প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ডক্টর আবদুল করিমের ‘বাংলার ইতিহাস : মুসলিম বিজয় থেকে সিপাহী বিপ্লব পর্যন্ত [১২০০–১৮৫৭]’ গ্রন্থে বর্ণিত ঐতিহাসিক তথ্য ও বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে রচিত। মধ্যযুগের রাজদরবারে বাংলা সাহিত্যের যে ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, তা বর্তমান প্রজন্মের কাছে সহজবোধ্যভাবে তুলে ধরাই এই নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।“
বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের পাতায় মুসলিম শাসনকাল কেবল এক রাজনৈতিক পরিবর্তনের নাম নয়, বরং তা ছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্ধকার যুগ থেকে উত্তরণের এক স্বর্ণালি অধ্যায়। বিশেষ করে সুলতানি আমলের উদার পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে আজকের সমৃদ্ধ বাংলা ভাষা হয়তো ইতিহাসের গর্ভে হারিয়ে যেত। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ডক্টর আবদুল করিম তাঁর ‘বাংলার ইতিহাস : মুসলিম বিজয় থেকে সিপাহী বিপ্লব পর্যন্ত’ গ্রন্থে অত্যন্ত অকাট্য যুক্তি ও তথ্যের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, কীভাবে মুসলিম সুলতানদের হাত ধরেই বাংলা ভাষা ‘ব্রাত্য’ থেকে ‘রাজসিংহাসনে’ আরোহণ করেছিল।
মুসলিম বিজয়ের পূর্বে বাংলার সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে ব্রাহ্মণ্যবাদের কঠোর আধিপত্য ছিল। তৎকালীন উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজ সংস্কৃতকে ‘আভিজাত্যের প্রতীক’ ও ‘দেবভাষা’ মনে করত। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের ভাষা তথা বাংলা ছিল তাদের কাছে ব্রাত্য বা অপবিত্র। কথিত ছিল— “অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানি চ। ভাষায়াং মানবঃ শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ।”
অর্থাৎ, যারা বাংলায় রামের ১৮টি চরিত বা পুরাণ শুনবে, তাদের রৌরব নামক নরকে যেতে হবে। এই ধর্মীয় কড়াকড়ির ফলে বাংলা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা পায়নি। এই সংকীর্ণতা ও সংস্কৃতের আধিপত্য বাংলা সাহিত্যের বিকাশে ছিল এক বিরাট অন্তরায়।
১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজীর বঙ্গবিজয়ের ফলে এই রুদ্ধদ্বার পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। মুসলিম শাসকরা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন আরবি ও ফারসি ভাষা। ফারসি রাজদরবারের ভাষা হওয়ায় সংস্কৃত তার একচ্ছত্র আধিপত্য ও রাজকীয় তকমা হারায়। মুসলিম সুলতানরা স্থানীয় ভাষার প্রতি কোনো ধর্মীয় গোঁড়ামি পোষণ করতেন না; বরং তাঁরা ছিলেন শিল্পমনা ও স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী। এই নিরপেক্ষ অবস্থানই বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতের কঠোর বেষ্টনী থেকে মুক্তি দেয়।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মুসলিম শাসকদের সবচেয়ে বৈপ্লবিক অবদান হলো সংস্কৃত ধর্মগ্রন্থগুলোকে বাংলা ভাষায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে তাঁদের সরাসরি উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা। তারা রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবত পুরাণের বাংলা অনুবাদ করিয়ে সাধারণের কাছে বাংলা ভাষার সাহিত্য ছড়িয়ে দেন।
সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ও আলাউদ্দিন হোসেন শাহের মতো শাসকরা হিন্দু কবিদের দিয়ে রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবত পুরাণ বাংলায় অনুবাদ করান।
সুলতানদের উৎসাহেই কৃত্তিবাস ওঝা ‘শ্রীরামপাঞ্চালী’ এবং মালাধর বসু ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ (ভাগবত পুরাণের অনুবাদ) রচনা করেন। মালাধর বসুকে সুলতান রুকনউদ্দিন বারবাক শাহ ‘গুণরাজ খাঁ’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
চট্টগ্রামের লস্কর পরাগল খাঁ ও ছুটি খাঁর নির্দেশে কবীন্দ্র পরমেশ্বর এবং শ্রীকর নন্দী মহাভারতের অনুবাদ সম্পন্ন করেন। এই উদ্যোগের ফলেই ধর্মগ্রন্থগুলো সংস্কৃতের দেয়াল ভেঙে সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ পায়।
মুসলিম বিজয়ের আগে বাংলা গৌড়, বঙ্গ, রাঢ় ও সমতটের মতো বিচ্ছিন্ন জনপদে বিভক্ত ছিল। সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ পুরো এলাকা জয় করে যখন নিজেকে ‘শাহ-ই-বাঙালিয়ান’ হিসেবে ঘোষণা করেন, তখন থেকেই ভৌগোলিক সংহতির পাশাপাশি ভাষাগত সংহতিও তৈরি হয়। এই রাজনৈতিক ঐক্যই বাংলা ভাষাকে একটি ‘জাতীয় ভাষা’ হিসেবে দাঁড়াতে সাহায্য করে এবং প্রশাসনিক কাজে এর গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়।
ফারসি ও বাংলার মেলবন্ধনে বাংলা ভাষা নতুন শক্তিতে বলীয়ান হয়। আরবি, ফারসি ও তুর্কি শব্দের ব্যাপক অনুপ্রবেশে বাংলা শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়।
ডক্টর আবদুল করিমের মতে, মুসলমান শাসকরাই বাংলা ভাষায় প্রথম রোমান্টিক সাহিত্যের প্রচলন করেন। হিন্দুরা প্রধানত দেবদেবী কেন্দ্রিক ধর্মীয় বিষয়বস্ত্ত নিয়ে লিখলেও, মুসলমানরা সাহিত্যে রক্ত-মাংসের মানুষ তথা মানব-মানবীর প্রেম কাহিনীর প্রচলন করে সাহিত্যকে লৌকিক ও আধুনিক রূপ দান করেন।
ডক্টর আবদুল করিমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমল ছিল বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ। সুলতানি আমলের এই উদার ও নিরাপদ পরিবেশই শ্রীচৈতন্যদেবকে তাঁর বৈষ্ণব ধর্ম ও সাহিত্য প্রচারের সুযোগ করে দিয়েছিল। যদি তৎকালীন শাসকরা অসহিষ্ণু হতেন, তবে বৈষ্ণব পদাবলির মতো বিশাল সাহিত্যভাণ্ডার তৈরি হওয়া কঠিন হতো।
ঐতিহাসিক দীনেশচন্দ্র সেন যথার্থই স্বীকার করেছেন যে, যদি মুসলিম বিজয় না ঘটত, তবে বাংলা ভাষা হয়তো পালি বা প্রাকৃতের মতো কোনো এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যেত কিংবা অবহেলিত উপভাষা হিসেবে থেকে যেত। মূলত মুসলিম শাসকদের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, উদারতা এবং পৃষ্ঠপোষকতাই বাংলাকে “চাষাভুষার ভাষা”র অপবাদ থেকে মুক্ত করে সাহিত্যের রাজসিংহাসনে বসিয়েছিল। আজকের আধুনিক বাংলা ভাষার যে শক্ত ভিত্তি, তার মূল গাঁথুনিটি তৈরি হয়েছিল মধ্যযুগের সেই রাজদরবারগুলোতেই।
তথ্যসূত্র: বাংলার ইতিহাস : মুসলিম বিজয় থেকে সিপাহী বিপ্লব পর্যন্ত [১২০০-১৮৫৭], ডক্টর আবদুল করিম।
















