“১৮ বছর ধরে গাছের সাথে শিকলবন্দি বনলতার জীবন”
- আপডেট সময় : ১১:৪৯:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
- / 59
মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার নয়াকান্দি গ্রামের বনণতা হালদারের জীবনের ১৮ বছর কেটে গেছে এভাবেই গাছের সাথে শিকলবন্দি থেকে। ছবি- সংগৃহিত
যে বয়সে ডানা মেলে আকাশে ওড়ার কথা, চারপাশের রঙিন স্বপ্নগুলোকে মুঠোয় পুরে নেওয়ার কথা—ঠিক সেই কৈশোরেই বনলতা হালদারের পায়ে জড়িয়ে গিয়েছিল লোহার ভারী শিকল। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ১৮টি বছর, প্রায় সাড়ে ছয় হাজার দিন-রাত। মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার নয়াকান্দি গ্রামের এই তরুণীর জীবন এখন থমকে আছে পুকুরপাড়ের একটা গাছের গোড়ায়।
মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার নবগ্রাম ইউনিয়নের নয়াকান্দি গ্রামের মৃত কার্তিক হালদারের মেয়ে বনলতা। অভাবের সংসারে মা ও দুই ভাই অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। চরম দারিদ্র্যের কারণে বনলতার উন্নত চিকিৎসা করাতে পারছে না পরিবার। ফলে তাঁর জীবন এখন আটকে গেছে গাছে বাঁধা শিকলের সাথেই।
জানা যায়, অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় হঠাৎ করেই তার মানসিক ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। শুরুতে কিছুটা চিকিৎসা হলেও বাবা কার্তিক হালদারের আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো পরিবারটি অকূল দরিয়ায় পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় মেধাবী বনলতার চিকিৎসা। এরপর প্রতিবেশীদের নিরাপত্তার অজুহাত আর অর্থাভাব—সব মিলিয়ে বনলতার ঠিকানা হয় পুকুরপাড়ের এক নির্জন গাছতলা।
রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-তুফান কিংবা কনকনে শীত—প্রকৃতির সব নিষ্ঠুরতা সয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা, কখনো বা পার হয়ে যায় পুরো রাত, বনলতার সঙ্গী কেবলই পায়ের ওই লোহার শিকলটা। ক্ষুধা লাগলে মুখে জোটে না ঠিকমতো অন্ন, আর মনের ভেতরের কষ্টের কথা বোঝার মতো কেউ নেই চারপাশে।
অসহায় মা আর দুই ভাই অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে কোনোমতে পেটের ভাত জোগাড় করেন। সেখান থেকে বনলতার উন্নত চিকিৎসার খরচ চালানো তাদের পক্ষে অসম্ভব বলে তারা জানাচ্ছে।
বনলতার বড় ভাই মিন্টু হালদার বোনের এই করুণ দশা জানাতে গিয়ে বলেন: “১৮ বছর বয়স থেকে তার এই সমস্যা বাড়তে থাকে। তিনি বলেন, আমাদের সেই সামর্থ্য ছিলোনা যে তাকে ভালো চিকিৎসা করাবো। মানুষ দেখলেই ও খুব উত্তেজিত হয়ে যায়, চিৎকার করে। তাই বাধ্য হয়ে গাছের সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখি। মিন্টু বলেন, কোনো সহৃদয় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে হয়তো বোনটা আমার আবার সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরত।
ডাসার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকিয়া সুলতানা বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে আসার পর সমাজসেবা অফিসের মাধ্যমে তাকে প্রতিবন্ধী কার্ড দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যরা যদি তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে রাজি থাকেন, তবে সরকারিভাবে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।”
দেড় যুগ ধরে বাড়ির পাশে পুকুরপাড়ে গাছের সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা বনলতা অমানবিক ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করে তাঁকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার দাবি জানান স্থানীয়রা।












