তিন দশকের অবহেলা ফরিদপুর ব্যাপ্টিস্ট চার্চ মিশনে
“জরাজীর্ণ ইট আর কাদামাটির পথে স্থবির জনজীবন”
- আপডেট সময় : ০২:১২:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
- / 258
ফরিদপুর পৌরসভা থেকে মাত্র ৮০০ মিটার দূরত্বেই অবস্থিত ফরিদপুর ব্যাপ্টিস্ট চার্চ মিশন। শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত হয়েও এলাকাটিতে অর্ধেক ইট আর অর্ধেক মাটির রাস্তা দিয়েই চলাচলের করতে হচ্ছে এলাকাবাসীর। ফরিদপুর জিলা স্কুলের পূর্ব পাশের সীমানা প্রাচীরের পর থেকে শুরু হয়ে ২ নং হাবেলী গোপালপুরের রকিবউদ্দিন সড়কের সীমানা পর্যন্ত কয়েকশত খ্রিষ্টান,সনাতনী এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের বসতি এখানে।এলাকাটি শুধুমাত্র খ্রিস্টান সম্প্রদায়ই নয় পাশাপাশি সনাতনী ও মুসলিম সম্প্রদায়ও স্থায়ীভাবে বসবাস করছে।
তবে বর্তমানে এলাকাবাসীর চরম আক্ষেপের জায়গা এখানকার প্রধান সড়কটি। দীর্ঘ ৩০ বছর পূর্বে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে ইটের সলিং দিয়ে এই এলাকার সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ তিন দশকেও আধুনিকায়নের কোনো ছোঁয়া লাগেনি। সেই রাস্তাটিও সংস্কারের অভাবে ১২ ফুট থেকে দুই পাশ ভেঙে মাত্র ৬ ফুটে এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে জরুরি প্রয়োজনে কোনো অ্যাম্বুলেন্স,ফায়ার সার্ভিসের সহ বড় গাড়ি সহজেই প্রবেশ করতে পারছে না।
এই এলাকাটিতে ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ব্যাপ্টিস্ট চার্চ স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যার শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত রয়েছে। এখানে অবস্থিত ‘মধ্য দক্ষিণ শিশু উন্নয়ন প্রকল্পে’ প্রায় ৪০০-৫০০ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে। রয়েছে ৫০ জন অসচ্ছল শিক্ষার্থীর আবাসনের ‘এল বারবার মেমোরিয়াল হোস্টেল’। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য রয়েছে ‘টুইঙ্কেল স্পেশালাইজড স্কুল’ সহ বিভিন্ন ছোট-বড় অর্থনৈতিক এবং সংগীত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও এখানে রয়েছে। এক সময় এই এলাকাটিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দক্ষিণবঙ্গের খ্রিস্টান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেন্টার। যেখানে কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। পাশাপাশি বিভিন্ন বড় ও ছোট যন্ত্রাংশ মেরামতের ওয়ার্কশপও ছিল।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, এই এলাকাটিতে আনুমানিক ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে দিকে বসতি স্থাপিত হয়েছিলো এবং ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে গির্জাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জন্য সমাধিস্থলসহ রয়েছে। এই সমাধিস্থলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের সমাধিস্থল সহ বেশ কিছু হেরিটেজ বিল্ডিং রয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের আঞ্চলিক গোডাউনও স্থাপিত হয়েছে এই এলাকাটিতে। একসময় এখান থেকেই মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছাতে ভ্রাম্যমাণ ডিসপেন্সারি চালু ছিল। কিন্তু বর্তমানের ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে এলাকার সেই প্রাণচাঞ্চল্যও এখন ম্লান।
এই এলাকারই বাসিন্দা জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সংগীতশিল্পী ও স্থানীয় ট্রাস্ট বোর্ডের সদস্য স্টিভ তুর্য বলেন, “এই ব্যাপিস্ট চার্চ এলাকাটি ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে চার্চ কিনে নেওয়া হয়েছিলো। পূর্বে বসতি কম থাকলেও বর্তমানে এখন কয়েক শত পরিবার বসবাস করে। সকলের দিক বিবেচনা করে এই রাস্তাটি পাকা করা অতি জরুরী ”
ফরিদপুর ব্যাপ্টিস্ট চার্চের সহ-সম্পাদক পল পিকলু বিশ্বাস সড়কের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে বলেন “বর্তমানে এই রাস্তা দিয়ে হাঁটাচলাই দুষ্কর হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ড্রেনের কাজ শুরু হলেও তা সমন্বয়ে র অভাবে ভোগান্তির আরেক কারন হয়ে দাড়িয়েছে। পুরো এলাকাজুড়ে পরিকল্পিতভাবে ড্রেন নির্মাণ হলে ভালো হতো। তবে এখন আমরা আর দেরি না করে এই ভোগান্তি স্থায়ী সমাধান চাই ।”
সরেজমিনে এলাকাবাসীর সাথে কথা বললে তারা রাস্তা নিয়ে দুঃখ দুর্দশার কথাই তুলে ধরে আক্ষেপ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিরা এসে সংস্কারের আশ্বাস দিলেও পরবর্তীতে তা করার জন্যও আক্ষেপ প্রকাশ করেন। রাস্তার সাথে ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকার কারণে বাসা বাড়ির ময়লা পানি নিয়ে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তারা আরো বলেন বাসা বাড়ির ময়লা পানিগুলো প্রতিদিনই পুকুরেই পড়ছে। এতে তিনটি পুকুরের সবগুলোই চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ করেন।
এলাকাটিতে অনেক প্রবীণ, নারী, শিশু থাকার কারনে তাদেরও চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। ইটের গর্তে মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনাও ঘটতে দেখা যায়। এলাকাটির সবচেয়ে প্রবীণ ৯১ বছর বয়সী পিটার এ.কে বিশ্বাস বলেন “এই এলাকাটিতেই আমার বড় হওয়া, প্রথম থেকেই রাস্তার সমস্যা ছিলো। সেই সমস্যা এখন আমাদের তৃতীয় প্রজন্মকেও ভোগাচ্ছে ভোগাচ্ছে ”।
এ বিষয়ে ফরিদপুর ব্যাপ্টিস্ট চার্চ এর সাধারণ সম্পাদক উইলিয়াম কাঞ্জিলাল বলেন “ফরিদপুরের মত একটি পৌরসভা যা সিটি কর্পোরেশন এ উন্নত করার একটি পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। সেই পৌরসভার ৩ কি.মি আওতাধীন শতবছর পুরনো পুলিশ লাইনের সামনে, ব্যাপ্টিস্ট মিশনের প্রশস্ত রাস্তাটি এখনও ইটের রাস্তাই রয়েছে। যা বিগত দিনে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের অর্থায়নে করা। এ রাস্তাটি পাকা করার বিষয়ে পৌরসভায় দরখাস্ত করা হলেও আশ্বস্ত করা ছাড়া পৌরসভার কোন কার্যকর ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়নি”
এ বিষয়ে ফরিদপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শামসুল আলম বলেন ” পৌরসভার এলাকা বৃদ্ধির কারণে আমাদের কাজের প্রচুর চাপ রয়েছে । আমরা বিভিন্ন এলাকার কাজগুলো ধাপে ধাপে শেষ করার চেষ্টা করছি। আশাকরি দ্রুতই এসব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে ”












