শহর ফরিদপুর ও গণিকালয়ের ডেরা: কার কান্না কত ভারী?
- আপডেট সময় : ০১:৩১:০১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
- / 172
আবাসিক এলাকা হিসেবে শুধু রথখোলা কিংবা সিংপাড়ার বাসিন্দাদের জন্যই নয়—শান্তশিষ্ট ফরিদপুর শহরের বুকে এটি যেন প্রায় অর্ধশতক ধরে জমে থাকা এক দগদগে ক্ষত; যার কোনো উপশমের পথ অদ্যাবধি মেলেনি। পাক-ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত আউলিয়া শেখ ফরিদ (রহ.)-এর পুণ্যস্মৃতি বিজড়িত এই শহরের ইতিহাস বহু পুরোনো।
ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। নদীর এপাড়ে পূর্ব খাবাসপুর; তখন লঞ্চঘাটে দড়ি বেঁধে নৌকা পারাপার হতো। প্রতিদিন সকালে বাজারে মাছ কিনতে যাওয়ার পথে হাজী শরীয়তুল্লাহ বাজারের পেছনের গলিটিতে একটি চেনা দৃশ্য চোখে পড়ত। ছালার পর্দা টাঙিয়ে সেজেগুজে খদ্দেরের আশায় দাঁড়িয়ে থাকত একদল নারী।
এই গণিকালয়ে তাদের কাছে আসা সিংহভাগ মানুষই নিম্ন আয়ের। শিক্ষার আলো না পাওয়ায় ‘বিনোদন’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ জানার সুযোগ তাদের কোনোদিন হয়নি। একঘেয়ে ও ক্লান্তিঘেরা জীবনে একটু চাঙ্গা হওয়ার লোভে তারা বেছে নিত ওই অন্ধকার গলি।
শুধু এই শ্রেণির-ই নয়, মাদকাসক্ত তরুণ, শিক্ষিত বেকার, উঠতি বয়সী কিশোর থেকে শুরু করে মার্কেটের বয়স্ক দোকানদার আর পরিবহন শ্রমিক—নানা পদের মানুষের যাতায়াত সেখানে। সামান্য দু’পয়সায় দেহ কিনে নিজেকে ‘ছুপা রুস্তম’ জাহির করার কী আপ্রাণ কসরত তাদের প্রতিদিন! শেষমেশ এদের অনেকে সিফিলিস আর গণোরিয়ায় ভুগে নিঃস্ব হতো। কারও আবার সেখানে ‘বাঁধা নারী’ থাকত; কেউবা তাদের প্রেমে পড়ে ঘর-সংসার ভেসে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়েও সেখানে নতুন জীবন গড়ার অলীক স্বপ্নে বিভোর হতো।
এই অন্ধকার জগতের প্রভাবে প্রতিনিয়ত ভেঙে চুরমার হয়ে যায় কত গৃহবধূর স্বপ্ন। বাবার পরিচয় দিতে না পেরে আজীবন লজ্জার বোঝা বয়ে বেড়ায় কত সন্তান। আর নিজের ছেলের এমন কুপথে যাওয়ার খবর জেনে গোপনে চোখের জল ফেলেন কত অসহায় বাবা-মা।
ভিতরে চলে দেহের পসরা, আর বাইরে জমে ওঠে মদ ও গাঁজার বেচাকেনা। পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে শুধু টাকার খেলা! কিন্তু সেখানে কি কেবল খদ্দেরদেরই আনাগোনা? কত কিসিমের মানুষের যে আয়ের ধান্দা এই গলিকে ঘিরে! নতুন আসা অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের আইনি ‘লাইসেন্স’ করিয়ে দেওয়ার জন্য উকিলের মুখচেনা মোহরি থেকে শুরু করে পুলিশের সোর্স, সাংবাদিক, পাড়ার মাস্তান, পকেটমার, ছিঁচকে চোর, পেশাদার খুনি, ছিনতাইকারী ও ভাড়াটে সন্ত্রাসী—সবাই জড়ো হয় এই এক ছাদের নিচে।
এখন আর কাজের প্রয়োজন ছাড়া ওপথে যাওয়া হয় না। তবে কখনো যাওয়া হলে দেখি, পরিবেশটা আগের মতোই আছে। শুধু পুরোনো মুখগুলো হারিয়ে গেছে, জায়গায় এসেছে নতুন কিছু চেনা-অচেনা চেহারা।
পেশাগত কারণে বছরকয়েক আগে এক পরিচিত লোকের মাধ্যমে আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিল সেখানকার এক প্রভাবশালী সর্দারনি—নাম তার ‘ববি’। সুদর্শনা এই নারী ব্যবসা সামলানোর আড়ালে কত মেয়ের জীবন চিরতরে ধ্বংস করেছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এই তো কিছুদিন আগেও কোতোয়ালি থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে দুটি মেয়েকে উদ্ধার করে। দূর ফেনি আর চাঁদপুর থেকে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ঢাকা হয়ে এনে মেয়ে দুটিকে ববির কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল দুই যুবক। পুলিশ একজনকে উদ্ধার করতে গিয়ে অন্যজনের সন্ধান পায়। ওই মামলায় ‘ববি’ এখন ফেরারি।
আমার কাছে ‘ববি’র ডাক আসার পেছনের ঘটনাটিও প্রায় একই রকম ছিল। ‘ববি’র ডেরা থেকে এক মেয়ে মাঝরাতে পালিয়ে সাধারণ মানুষের সহায়তায় পুলিশের হাতে পৌঁছায়। থানায় প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হলে, বাইরে ওৎ পেতে থাকা ‘ববি’র দালালেরা তাকে জোর করে আবার ওই গলিতে ফিরিয়ে আনে। সে সময় সিঙ্গার শোরুমে কর্মরত আমার এক পরিচিত ছোটভাইয়ের সাথে সখ্য গড়ে তোলে ‘ববি’। যখন সে জানতে পারে ওই যুবকের এক ভাই সাংবাদিক, তখন সে ছোটভাইটিকে দিয়েই আমাকে তার আস্তানায় ডেকে পাঠায়।
আমাকে আগে থেকে কিছু না জানিয়েই সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ববির আসল উদ্দেশ্য ছিল একটি খবর ছাপানো—যেখানে দেখানো হবে তারা কোনো মেয়েকে জোর করে আটকে রাখে না, বরং মেয়েরা স্বেচ্ছায় ও ভালোবাসার টানেই সেখানে থাকে।
‘ববি’র ডেরায় পৌঁছানোর পর যখন সেই মেয়েটিকে আমার সামনে আনা হলো, তার মুখ থেকেই শুনলাম সত্য ঘটনাটি। তার অব্যক্ত বেদনার সারমর্ম বোঝার চেষ্টা করলাম। উপলব্ধি করলাম—এই চোরাগলির ঘেরাটোপে বন্দি মেয়েরা নিজেদের আইনগত অধিকার সম্পর্কে কতটা অসচেতন এবং কতটা জিম্মি! অনুসন্ধান শেষে যখন প্রকৃত সত্য তুলে ধরে পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ করলাম, স্বভাবতই তা সর্দারনি ‘ববি’র পছন্দ হয়নি। পরবর্তীতে সে ওই ছোটভাইকে তার অসন্তোষের কথা জানায় এবং কাজ হাসিল হবে না বুঝে তার সাথে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
এই ‘ববি’র বোন ফুরফুরি বেগমও রথখোলা পতিতাপল্লীর আরেক প্রতাপশালী চরিত্র। ‘ববি’র মায়ের দোতলা ভবনের প্রায় ৩০টি কক্ষে চলে তাদের এই জঘন্য ব্যবসা। কথোপকথনের একপর্যায়ে আমি জানতে চেয়েছিলাম—”এই বাড়ি কি আপনার?” সে উত্তর দিয়েছিল—”না, এটি আম্মার।”
আম্মা কোথায় জানতে চাইলে ‘ববি’ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলেছিল—”আম্মা তো হজ্জে গেছেন!”
উত্তর শুনে আমার স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়! বাড়িতে রীতিমতো দেহব্যবসার ঘাঁটি চালু রেখে তিনি গেছেন পবিত্র হজ্জ পালনে! এই বৈপরীত্য দেখে আর কী-ই বা বলার থাকে!
ছোটবেলায় যখন কুমার নদে গোসল করতে নামতাম, দেখতাম পানির ওপর ভেসে আসছে ব্যবহৃত কনডমের সারি। ভাসতে ভাসতে নদীপাড়ের কাছাকাছি চলে আসা সেসব বস্তু অনেক অজ্ঞ শিশু হয়তো বেলুন ভেবে ফোলাতে মুখে পুরে নিত। গণিকালয়ে পৌরুষ দেখাতে আসা খদ্দেরদের নোংরামিতে ভরা সেসব কনডম দেখে ঘৃণায় আর নদীতে নামতে মন চাইত না। তবু প্রতিদিনের একই দৃশ্য ছিল নদীর পানিতে।
শহরের প্রাণকেন্দ্রে এমন একটি অন্ধকার জগতের অভয়ারণ্য দেখে বুক ঠেলে কান্না আসে। কষ্ট হয় স্বাভাবিক জীবন হারানো অগণিত মা-বোনের জন্য; চোখের সামনে তাদের নিঃশব্দ অসহায়ত্ব দেখেও কিছু করতে না পারার যন্ত্রণা পোড়ায়। বাহ্যিক সাজগোজের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ‘ববি’দের মতো সর্দারনিদের হাতে নির্মম নির্যাতনের হাজারো করুণ অধ্যায়। প্রতিদিন রাতে সেখানে জমা হয় ডুকরে কান্নার শত শত ইতিহাস—যাদের খবর কেউ রাখে না।
কত শত মেয়ে যে নিজের অজান্তে, ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে এই চোরাগলিতে এসে আটকা পড়েছে! তাদের ক’জনই বা স্বেচ্ছায় লাইসেন্স নিয়ে এই পেশায় এসেছে? সিংহভাগই কম বয়সে প্রতারণার ফাঁদে পড়ে জীবন ধ্বংস করেছে। আর কাগুজে লাইসেন্স? টাকা ফেললেই তো তা সহজে মিলে যায়! প্রতিবছর দালালের খপ্পরে পড়ে চাকরির আশায় এসে গোপনে বিক্রি হচ্ছে কত সম্ভাবনাময় প্রাণ, আর কপালে জুটে যাচ্ছে আইনি সীলমোহর।
পৃথিবী থেকে দাসপ্রথা উচ্ছেদ হয়েছে বহু আগে। কিন্তু আধুনিক এই রূপ পরিবর্তিত গণিকালয়ে সর্দারনিদের কাছে বিক্রি হয়ে কত শত নারী যে আজও ক্রীীতদাসী হয়ে চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে—সেই খবর কি আমাদের সমাজ বা নারী অধিকার কর্মীরা রাখেন? এরা আসলে আধুনিক যুগের যৌনদাসী—খদ্দেরের দাসী, সর্দারনির দাসী, আর এক মনোবিকারগ্রস্ত সমাজের শিকার।
স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কোনো অধিকার এদের নেই; এদের সন্তানদের সমাজে মাথা উঁচু করে বড় হওয়ার সুযোগ নেই। এই সুযোগে এনজিওর নামে চলে বাণিজ্যিক তৎপরতা। সমবায় সমিতির নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় মহাজনেরা; কাস্টমাররা ঠকায়, সর্দারনি শোষণ করে। অথচ এই চার দেয়ালের বাইরে এসে প্রতিকার চাওয়ার পথটি তাদের জন্য বন্ধ। কারণ, একটি প্রাতিষ্ঠানিক লাইসেন্স তাদের গায়ে দাগ কেটে দিয়েছে—‘তুমি বন্দি, তুমি শুধু ভোগের পণ্য।’
একসময় এই নারীরা বাইরে বের হলে পায়ে জুতা বা স্যান্ডেল পরার অধিকার পেত না। এখন অবশ্য দৃশ্যপট কিছুটা বদলেছে। তারা বিভিন্ন বাসাবাড়িতে ভাড়ায় যাচ্ছে; ফ্ল্যাট বাসা ভাড়া নিয়ে গোপনে এই ব্যবসা চালানোর প্রবণতা বাড়ছে। দ্রুত কাঁচা টাকা উপার্জনের মোহ থেকে অনেকে একে পথ হিসেবে বেছে নিচ্ছে। শুনছি, শহরের উপকণ্ঠে গঙ্গাবর্দীতেও নাকি এমন একটি আস্তানা গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগের শেষ নেই, কিন্তু অজ্ঞাত কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ে না।
অথচ এদের কারণে এই শহরের হাজার হাজার যুবক প্রতিদিন নরকের পথে পা বাড়াচ্ছে—তার দায় কার?
মনে প্রশ্ন জাগে—আইন করে এই দেশে পতিতাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া কি খুব জরুরি ছিল? কিংবা মদ ও মাতলামির লাইসেন্স দেওয়া কি এতই প্রয়োজন ছিল? অবশ্য লাইসেন্সের ব্যবস্থা না থাকলে অবৈধ সুযোগসন্ধানীদের আইনের ভয় দেখিয়ে উপরি আয় করার পথ বন্ধ হয়ে যেত! আবার এক শ্রেণির মানুষের কাছে যেন ঔপনিবেশিক শাসন আজও অনুকরণীয়। যারা আমাদের শোষণ করেছে, রক্ত ঝরিয়েছে—তাদের রেখে যাওয়া পুরোনো আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করেই আজও এ দেশে নষ্ট হওয়া এবং অন্যকে নষ্ট করার সরকারি অনুমোদন পাওয়া যায়!
অন্যদিকে, সমাজের এই চরম অবক্ষয়কে ঢেকে রাখতে এবং অপকর্মের গ্লানি আড়াল করতে মহানুভবতার অভিনব নাটকও চলে। আমাদের ফরিদপুরের রথখোলার তেমনই একজন পরিচিত মুখ ‘পারুল বাড়িওয়ালি’। নিজের বাড়িতে শত শত মেয়েকে আটকে রেখে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এই সর্দারনিকে কেউ কেউ যেন মহীয়সী বানাতে পারলেই বাঁচে! নানা অজুহাতে তাদের অসহায়ত্ব তুলে ধরে এই ব্যবসাকে একধরনের সামাজিক বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা চলে। এমনকি স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণে পারুল বাড়িওয়ালির অনুদানের কথা বড় মুখে প্রচার করা হয়!
যে সমাজ বা প্রতিষ্ঠানের কোনো সামাজিক স্বীকৃতিহীন অন্ধকার আস্তানা থেকে টাকা তুলে আনতে হয়, তাদের তো লজ্জা পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু উল্টো সেই টাকাকেই গৌরবের সাথে দেখানো হয়। কেউ কি কখনো ভেবে দেখেছে—নির্যাতিত, বঞ্চিত সেই মেয়েদের অশ্রু আর রক্ত জল করা উপার্জনের কতটা অংশ জমা হয়েছে সর্দারনিদের এই তথাকথিত অনুদানের তহবিলে?
শুনলে অবাক হতে হয়, এই শহরে কোনো কোনো লিল্লাহ বোর্ডিংও নাকি চলে বাইজির দানে! কথায় বলে না—”ভিক্ষার চাল কাড়া আর আকাড়া!” একসময় তো হাউজি খেলার নামে কুপন বেচে মোটরবাইক আর লাখপতি বানানোর ব্যবসা চলত ক্রীড়া উন্নয়নের দোহাই দিয়ে।
‘বেশ্যা’ শব্দটি সমাজে এক নিকৃষ্ট গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু পেটের তাগিদে বা নিয়তির নিষ্ঠুরতায় এই গহ্বরে আটকে যাওয়া নারীদের আমি গালি দিতে চাই না। তাই শ্রদ্ধার সাথে তাদের ‘রূপোপজীবিনী’ বলে ডাকি—যারা রূপ বিক্রি করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। যদিও রথখোলার বাস্তবতায় সেই রূপের জৌলুস অনেক আগেই ফিকে হয়ে গেছে। আসল চেহারা ঢাকার জন্য রঙচঙ মেখে তারা মনোরঞ্জনে নামে; কিন্তু বাহ্যিক সাজগোজের চেয়ে তাদের ভেতরের জীবনটা হাজার গুণ বেশি বিবর্ণ।
কিন্তু ঠিক কী কারণে এই পেশার উদ্ভব হয়েছিল? কিংবা ফরিদপুর শহরের বুকে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে এরা এমন স্থায়ী আস্তানা গেড়ে বসল—সে কারণগুলো আজও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হয়নি।
তবে একটা প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—এই গণিকালয়ে আসা পুরুষেরা সমাজে কী ভূমিকা রাখছে? সময় বদলেছে, যুগ বদলেছে; কিন্তু এই অভিশপ্ত ব্যবস্থার রূপ বদলায়নি। কোনো অতৃপ্ত স্বামীর এই অন্ধকার গলিতে যাতায়াতের কারণে কত নারীর গোছানো সংসার ভাঙছে—তা নিয়ে কি কোনো গবেষণা হয়?
ছোটবেলায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘একা এবং কয়েকজন’ উপন্যাসে ‘সূর্য’ চরিত্রটির কথা পড়েছিলাম। একসময়ের স্বদেশী আন্দোলনের কর্মী সূর্য হৃদয়ের ব্যাকুলতা আর বিরহ সইতে না পেরে শেষমেশ বাইজির ডেরায় আশ্রয় নেয় এবং সেখানেই তার ট্র্যাজিক সমাপ্তি ঘটে। জানি না, রথখোলার এই অবাধ সুযোগের ফাঁদে পড়ে ফরিদপুর শহরের কত শত ‘সূর্য’-এর জীবন প্রতিদিন এভাবে তছনছ হয়ে যাচ্ছে!
বাস্তবতা হলো, ফরিদপুরের রথখোলা গণিকালয় এখন আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মানবপাচারের এক ভয়ংকর কেন্দ্রে পরিণত হতে চলেছে। সবার আগে এখানকার মেয়েগুলোর কথা ভাবা প্রয়োজন—তারা কীভাবে এলো, কেমন অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে, আর তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ কী?
আজ থেকে প্রায় দুই যুগ আগে এই রথখোলা থেকে পালিয়ে আসার সময় ‘সুমি’ নামের একটি মেয়েকে সর্দারনিদের হাত থেকে রক্ষা করার এক তিক্ত ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল। আবার ‘কুলসুম’ নামের আরেক মেয়েকে উদ্ধার করে আইনি ঝামেলা ছাড়াই তার বাবার কোলে ফিরিয়ে দেওয়ার আনন্দময় স্মৃতিও আছে। সেসব গল্প অন্যদিন বলব।
তবে আজ শেষ কথা এটাই—মানবপাচারের আন্তর্জাতিক বাজারে রথখোলার মতো জায়গাগুলো বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে। একটু অসতর্ক হলে কিংবা প্রশ্রয় পেলে থাইল্যান্ডের মতো এখানেও হয়তো কোনোদিন উন্মুক্ত রমরমা রূপের বাজার গড়ে উঠবে; কিংবা ডায়মন্ড হারবারের মতো গড়ে উঠবে বিশেষ রিসোর্ট! রাতের অন্ধকারে মুখোশ পরে বিকৃত আনন্দের মহোৎসবে মেতে উঠবে একদল মানুষ। কিন্তু সেই স্রোতে ভেসে যাওয়ার আগে আমাদের ভাবা উচিত—এই অন্ধকার সাম্রাজ্য জিইয়ে রেখে কার লাভ হচ্ছে, আর কার জীবন চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে?












