চোর-ডাকাতদের খাবার
- আপডেট সময় : ০৩:৫৩:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
- / 75
ক্ষুদ্র অথবা বিশাল; যাই বলেন, এই পৃথিবীতে কত রকমের মানুষ-কতশত জাতি। আবার এই সব মানুষের কত রকমের পেশা-বৃত্তি। স্বীকৃত কর্মগুলোই পেশা-বৃত্তি হিসেবে পরিচিতি পায়। এর বাইরেও কত মানুষ কত অস্বীকৃত-অবৈধ-অন্যায্য কর্মে নিয়োজিত থেকে জীবন পাড় করে থাকে। ভালো-মন্দ এবং ন্যায়-অন্যায়ের পার্সেন্টেজে কম বেশি হিসেবে জগতের কর্মসমূহ চলে আসছে। জগতের মানুষের প্রধানতম কর্মের মধ্যে ই রয়েছে ‘প্যাট’ আর ‘চ্যাট’ এর নানাবিধ প্রয়োগ। চ্যাট নিয়ে কোটিকোটি পৃষ্ঠায় অজস্র লেখা যেমন হয়েছে, প্যাট নিয়েও তারচেয়ে কম হয়নি। প্যাটের মূল কাজটাই হচ্ছে খাবারের ধান্দা। এই প্যাট তথা খাবারের ধান্দাই মানুষকে স্বীকৃত পেশা-বৃত্তির বাইরে অস্বীকৃত কর্মেও নিয়োজিত করে। অস্বীকৃত-অবৈধ-অন্যায্য কর্মসমূহের মধ্যে চুরি ডাকাতি অন্যতম। এক-দু‘শ বছর আগে এই ডাকাতির প্রভাব ছিল অতি ভয়ংকর। ডাকাতি করতে আসছে জেনে শুনেও মানুষ প্রতিবাদ বা প্রতিহত করার সাহস পেত না- নানা কারণেই। ডাকাতদের চাহিদা মতো সব কিছু সরবরাহ করতে হতো।
আগের দিনে ডাকাত আসলে চিঠি দিয়ে আসত, দাদীর মুখে শুনেছিলাম।
আগের দিনের হিসাব এখনকার দিন দিয়ে নির্ণয় সম্ভব নয়। অল্প বয়সিদের এটা কল্পনারও বাইরে। তখন চরাঞ্চল বলতে ছিল প্রকৃত পক্ষেই চরাঞ্চল। শহর থেকে চরের দূরত্ব কিলোমিটারের হিসেবে একই থাকলেও গমনাগমনের সময়ের পার্থক্য আকাশ পাতাল। এখন ১০ কিলোমিটার চরের দিকে যেতে ১৫/২০ মিনিট লাগলেও, তখন সাধারণ সময়ে এটা 6/7 ঘণ্টার উপরে লাগত। শুধু তাই নয়, পথও ছিল দুর্গম। কখনো হেঁটে, কখনো নৌকায়; কোথাও শুকনো, কোথাও পানি। এছাড়া বিশেষ পরিস্থিতিতে এই সময়ের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না। বর্ষা বা বন্যার সময়ে যাতায়াত ছিল খুবই যন্ত্রণাময়। যারা ওই এলাকার তৎসময়ের বাসিন্দা এবং যারা গমনাগমন করেছেন- তারা ছাড়া এটা অন্যদের বোঝা কষ্টসাধ্য।
ঠিক ওই সময়েই ছিল (বর্তমান সময় মতে) ডাকাতি করার বিচিত্র অকল্পনীয় এই পদ্ধতি। ডাকাতরা নিদিষ্ট দিন দিয়ে লিখে দিত কী কী রেডি রাখতে হবে। স্বর্ণ-রোপা, গহনা, টাকাপয়সা, গরু-ছাগল এগুলোর তালিকা থাকতো। আশ্চর্য হলেও সত্য, এই তালিকায় খাবারের আইটেমও লিখে দেয়া হত। দাদীর মুখে শুনেছি বড়ো সাজের খোলায় বানানো ভেজানো পিঠা, কুলশি পিঠা, হাতে কাটা সেমাই, আন্দোশা, পাকানো পিঠা, চিতৈ পিঠা, হাঁস-কুড়হ্যার মাংস, ভাত, বড়ো মাছ তো থাকতোই।
অনিচ্ছায় হলেও গৃহস্থের বাড়িতে এসব তৈরি করাই লাগত। কারণ ডাকাতরা চিঠিতে লিখে দিত, ডাকাতির কথা যদি পুলিশ-দারোগাকে জানানো হয়, তাহলে পরের বার সবগুলোকে খতম করা হবে। ডাকাতরা জানতো পুলিশ-দারোগাকে বললে একবারই ধরা খাবে, আর পরের বারতো বলে কয়ে আসবে না। তখন আসলে পুলিশ জানার আগেই সব খতম হয়ে যাবে।
দাদি ছাড়াও আরো অনেক বয়োজেষ্ঠর মুখেই এসব গল্প শুনতাম।
আবার এমনও গল্প শুনেছি, প্রতিপক্ষ বা শত্রুকে মারার জন্যও ব্যবহৃত এই খাবার। তথাকথিত অহংকার, গৌরব বা কথিত বংশের ইজ্জত রক্ষার নামে এই অমানবিক কার্যক্রম চলত। এসব ঘটনার সুনির্দিষ্ট স্থান, কাল বা পাত্র নির্ণয় সম্ভব নয়। তবে ধারণা করা যায়, এসব ঘটনা একেবারে কাল্পনিকও নয়। লোকমুখে প্রচলিত এ ঘটনাসমূহের নির্যাস উল্লেখ করা যায়।
দ্বন্দ্বের ব্যক্তিকে প্রথমে টার্গেট করা হত। তারপর তার সাথে নানা উপায়ে সুসম্পর্ক তৈরি করা হত। এ সুসম্পর্ক করতে যত দিনই লাগুক সেভাবে অপেক্ষা করা হত। অতঃপর একদিন দাওয়াতের নামে খাবারের আয়োজন করে তাকে ডাকা হত। সাধারণত রাত্রিবেলায় এ খাবারের আয়োজন করা হত। এই খাবারের আইটেম ওই চরাঞ্চলে যে নিদিষ্ট আইটেম থাকে তাই। খাবার রত থাকা অবস্থায় এক পর্যায়ে অতর্কিত আঘাত করে কার্যোদ্ধার করা হত।
দাদি একবার বলেছিলেন, কোনো এক গ্রামের গেরস্থের বাড়িতে সকাল বেলা হইচই পড়ে যায়,- ঘরের ‘সিঁদকাটা’ দেখে। নিশ্চিত চোর এসেছিল। কিন্তু বাড়ির সিন্দুক, বাক্স কোন কিছুতেই হাত পড়েনি। গোয়ালের গরু-বরহিও ঠিক আছে। হাঁস-মুরগির খোঁপও যেমন ছিল তেমন আছে। তাহলে চোর এসে করল কী?
ভেজানো পিঠার কোলার চারিপাশে পিঠার রস পড়ে থাকতে দেখে বাড়ির ছোট বউ কোলার ঢাকুন সরিয়েই চিৎকার করে উঠল, ‘ও আম্মা! কোলার মদ্দি কোন ভেজানো পিঠা নাই।’
শোনা যায় রাতে খাওয়ার পরে ৪৭ টি পিঠা ভেজানো হয়েছিল; গভীর রাতে চোর এসে সব সাবাড় করেছে।
চৈরা খাবার- কত যে আনন্দের সাক্ষী!
আবার এ খাবার নিয়ে কতই না বিষাদের ঘটনাপ্রবাহ নিভৃতে হারিয়ে গেছে; সময়ের স্রোতে!













