পাকিস্তানের প্রচেষ্টায় যুদ্ধবিরতিতে সম্মত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান
- আপডেট সময় : ১১:২২:০৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬
- / 120
দীর্ঘ উত্তেজনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান তাদের মিত্রদের নিয়ে লেবাননসহ সব অঞ্চলে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। এই সমঝোতায় পাকিস্তান প্রধান সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মূল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যুদ্ধবিরতি কার্যকরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
শুক্রবার ইসলামাবাদে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা এবং আগামীকাল শনিবার থেকে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। অবশ্য আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে ১১ এপ্রিল শনিবার।
ট্রাম্প ইতিমধ্যে আসিম মুনিরকে তাঁর ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। মুনিরের সঙ্গে মার্কিন ও ইরানি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের গভীর যোগাযোগ থাকায় পাকিস্তান এই আলোচনায় বাড়তি সুবিধা পেয়েছে।
বৃহস্পতিবার মধ্যপ্রাচ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে ‘আমার প্রিয় ভাই’ সম্বোধন করে ‘অক্লান্ত পরিশ্রমের’ জন্য তাঁদের গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরাগচির সেই বার্তাটি নিজের মালিকানাধীন ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ শেয়ার করেছেন, যা শান্তি আলোচনায় ইসলামাবাদের ভূমিকার প্রতি ওয়াশিংটনের সম্মতিরই ইঙ্গিত দেয়।
এর পরপরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে লিখেছেন, ‘অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আমি ঘোষণা করছি, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের নিয়ে লেবাননসহ সব জায়গায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা এখনই কার্যকর হবে।’
পাকিস্তানের দৈনিক ডন তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, কয়েক সপ্তাহের কূটনীতি, বিশেষ করে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে আড়ালে থেকে পাকিস্তান মরিয়া হয়ে যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছে, তার ফলাফল এই যুদ্ধবিরতি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পরপরই ইসলামাবাদ দ্রুত পদক্ষেপ নিতে শুরু করে বলেও ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়।
প্রথম হামলার কয়েক দিনের মধ্যে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা একাধিক রাজধানীতে নিজেদের কূটনৈতিক চ্যানেল সক্রিয় করতে শুরু করেন।
ডনের খবরে আরও বলা হয়, সর্বজনীনভাবে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে পাকিস্তান নিঃশব্দে নিজেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সেতু হিসেবে উপস্থাপন করে। দুই শত্রু দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই।
পাকিস্তান ওয়াশিংটনের সামনে ইরানের স্বার্থগুলো উপস্থাপন করেছে এবং ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ের সামনে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
পাকিস্তানের এ প্রচেষ্টা সবচেয়ে দৃশ্যমান হয়েছিল ২৯ ও ৩০ মার্চ। এ দুদিন পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিসর ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইসলামাবাদে সাক্ষাৎ করেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের নেতৃত্বে ওই সাক্ষাতে সামরিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি রোধ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা শুরুর ক্ষেত্র তৈরি করার ওপর মূল মনোযোগ দেওয়া হয়।
ডনের খবরে বলা হয়, পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইসলামাবাদে গঠনমূলক আলোচনার পরিকল্পনা করেন, যদিও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আলোচনা হয়নি।
কিন্তু ইসলামাবাদ তাতে হাল ছেড়ে না দিয়ে বরং তাদের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার গতি আরও জোরদার করে। আসিম মুনির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।
অন্যদিকে শাহবাজ শরিফ ও ইসহাক দার ওয়াশিংটন, মস্কো, বেইজিং, ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী, জিসিসির সদস্যদেশ, তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরবসহ এক ডজনের বেশি বিশ্বনেতা ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে গেছেন।
এর উদ্দেশ্য ছিল ‘সব পক্ষকে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানো, যা আনুষ্ঠানিক আলোচনার প্রথম ধাপ হিসেবে কাজ করবে।’
তবে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের এই কার্যকরী ভুমিকা ভারতের কাছে অস্বস্তিকর বলে খবর বেরিয়েছে।
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে ভারত স্বাগত জানিয়ে বিবৃতি দিলেও এই যুদ্ধবিরতিতে পাকিস্তান যে ভূমিকা পালন করেছে সে সম্পর্কে কোনো উল্লেখ করেনি দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভারতের তরফ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে পাকিস্তানের নামও নেই।
মাত্র দু’দিন আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আজ রাতে পুরো সভ্যতা মারা যাবে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।’ এরপর এক অজানা উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাহবাজ শরিফ তাঁর পক্ষ থেকে চীন, সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর ও কাতারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, একটি যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছাতে এই দেশগুলো ‘অমূল্য ও সর্বাত্মক সমর্থন’ দিয়েছে।
একই সঙ্গে শাহবাজ শরিফ ‘শান্তিকে একটি সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে অসাধারণ কৌশলগত দূরদৃষ্টি, প্রজ্ঞা এবং ধৈর্য প্রদর্শন করায়’ তিনি উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) ‘ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলো’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বকেও ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
পাকিস্তানের কর্মকর্তারা ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন। তাঁরা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ একেবারে সীমিত থাকার সময়েও যেন কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো খোলা থাকে, পাকিস্তান তা নিশ্চিত করতে চেয়েছে।
ডন জানায়, এপ্রিলের শুরুতে ‘যুদ্ধবিরতির রূপরেখা’ প্রস্তুত হয়। ইসলামাবাদ যু্দ্ধবিরতির ওই রূপরেখা সবাইকে পাঠিয়ে শত্রুতা স্থগিতের প্রস্তাব দেয়। ওই প্রস্তাবে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথে উত্তেজনা কমানোর পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
যদিও বিশেষ করে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকার নিয়ে তখনো তীব্র মতপার্থক্য ছিল; কিন্তু সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে পাহাড়সম চাপের কারণে একটি সমঝোতার ক্ষেত্র তৈরি হয়।
সময় যত গড়াতে থাকে, বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ভয়ও বাড়তে থাকে। এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে এবং তার ওপর ভিত্তি করে ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।












