মৌলিক সাংবাদিকতা: গতানুগতিকতার বাইরে নতুন কিছু তৈরির শিল্প
- আপডেট সময় : ১১:৪৭:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬
- / 113
বর্তমান সময়ের তথ্য-প্রযুক্তির জোয়ারে সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন নতুন কিছু বলা এবং মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। মৌলিক বা বেসিক সাংবাদিকতার জন্য প্রয়োজন বিশেষ নৈপুণ্য, যা কেবল তথ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ নয়, বরং গভীর অনুসন্ধান এবং কৌতূহল থেকে জন্ম নেয়। সেই নৈপুণ্য আপনি শিখতে পারেন, কিন্তু এই পেশায় অনেকে মনে করছেন এই বিশেষ নৈপুণ্য কাজে লাগানোর সুযোগ ক্রমশ: কমছে।
মৌলিক কাজের ভিত্তি: সময়, শ্রম ও মনোযোগ
মৌলিক সাংবাদিকতা কোনো দায়সারা কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম এবং একাগ্রতা। বর্তমান যুগে সাংবাদিকদের ওপর কাজের চাপ অনেক বেশি, যার ফলে অনেকেই কেবল ‘তথ্য প্রক্রিয়াজাতকারী’ হিসেবে আটকে যাচ্ছেন। কিন্তু একজন প্রকৃত সাংবাদিককে তথ্যের এই গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে হয়। আজকাল ইন্টারনেটে যেভাবে তথ্য এবং অপ-তথ্যের বন্যা বয়ে যাচ্ছে, সেখান থেকে সঠিক তথ্য খুঁজে পেতে গিয়ে ডুবে যাবার সম্ভাবনা থাকে।
মাত্র কয়েক বছর আগের তুলনায় সাংবাদিকদের এখন অনেক বেশি স্টোরি তৈরি করতে হয়। বেশি কাজ উৎপাদনের চাপে আপনি ভাবতে পারেন আপনার আসল কাজ হচ্ছে সব কিছু প্রক্রিয়াজাত করা, নতুন কোন গল্পের কথা ভাবা বা অনুসন্ধান করা নয়। কিন্তু দেশবিদেশের সাড়া জাগানো খ্যাতিমান সাংবাদিকেরাও দুশ্চিন্তায় থাকে তাদের কাজ কতটুকু মৌলিক বা অরিজিনাল হচ্ছে, তা নিয়ে। কোথা থেকে পরবর্তী অরিজিনাল স্টোরি আসবে, তা নিয়ে। এখানে কঠোর পরিশ্রম দরকার, শুধু কয়েকদিনের জন্য নয়, অনবরত। এখানে মনোভাবের প্রয়োজন হতে পারে এবং অভ্যাসের প্রয়োজন নির্ঘাত হবে। সিদ্ধান্তটা আপনার।
কৌতূহল: সাংবাদিকের প্রধান হাতিয়ার
সাংবাদিকতায় আপনি যদি পুরোপুরি উৎসুক না হন, তাহলে আপনি আপনার সময় নষ্ট করছেন। কিছু জানার ইচ্ছা দিয়েই স্টোরি খোঁজার কাজ শুরু হয়। আপনি যদি কখনোই নিজের একটি স্টোরি আইডিয়া মাথায় নিয়ে কাজে না আসেন, তাহলে আপনার স্টোরি খোঁজার কৌশল রপ্ত করা উচিত।
বিবিসি বেলফাস্ট টিমের একজন বলছেন তাদের এক সম্পাদক কী করতেন : ‘… তিনি একটি রাস্তার পুরোটা হেঁটে সবাইকে চ্যালেঞ্জ করতেন যে, তিনি সেই রাস্তার ৫০০ গজের মধ্যে অন্য সবার চেয়ে বেশি স্টোরি খুঁজে পাবেন। যেমন, রাস্তায় ময়লার পরিমাণ, পার্ক করার সুবিধা, নতুন গাড়ির সংখ্যা, ট্রাফিক পুলিশ, কফির দোকানে ধুমপানরত লোকজনে ভরা, কারণ অফিসে সিগারেট খাওয়া নিষেধ, দোকান খুলেছে, বন্ধ হচ্ছে, রাস্তায় ভিক্ষুক, নতুন বাড়ি-ঘর তৈরি হচ্ছে। আমরা কত দিন একটি নির্মাণাধীন ভবনের পাশ দিয়ে যাই কিন্তু কখনো জিজ্ঞেস করি না, আপনারা এখানে কী বানাচ্ছেন?’
আরেকজন সম্পাদক বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করেন : ‘আপনার মনে জানার আগ্রহ এতই প্রবল হতে হবে যে, আপনি একটি সাদা দেয়াল দেখে জানতে চাইবেন, এই দেয়ালে কিছুই নাই কেন?’
প্রশ্ন করুন, কেন …. এবং তারপর, কেন না।
কৌতূহলী মন জাগিয়ে তুলুন
মৌলিক চিন্তা কোনো জাদুর কাঠি নয়, এটি নিয়মিত অভ্যাসের বিষয়। আপনি অবশ্যই প্রাকটিস করবেন। তবে সাবধান থাকবেন, আপনি যদি বিষয়টি ভালমতো রপ্ত করে ফেলেন, তাহলে আপনি কিন্তু বেশ বিরক্তিকর মানুষ হয়ে যেতে পারেন! আপনি এমন একটি মনোভাব তৈরি করতে যাচ্ছেন, যার ফলে আপনি ‘কেন এরকম হলো’, বা ‘এখানে আসলে কী হচ্ছে’ ইত্যাদি প্রশ্ন চিন্তা না করে কারো কথা শুনতে পারবেন না, বা কোনো পত্রিকা বা ম্যাগাজিন পড়তে পারবেন না। এমনকি কোনো রাস্তা দিয়ে হেঁটেও যেতে পারবেন না। আপনি যা দেখলেন বা শুনলেন বা পড়লেন, সেটা দিয়ে যেসব প্রশ্নের জবাব পাননি, সেসব প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করতে নিজেকে বাধ্য করুন।
কিছু কার্যকরী উপায়
-
গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ: কোনো খবর পড়ার সময় ভাবুন সেখানে কোন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে সংবাদপত্রের ‘সংক্ষেপে বিশ্ব সংবাদ’ কলামের ছোট ছোট খবরগুলো নিয়ে গবেষণা করুন।
-
নিজেকে প্রশ্ন করা: কোনো ঘটনা শুনে আপনার প্রথম প্রতিক্রিয়া কী ছিল? নিজেকে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরিয়ে নিয়ে ভাবুন—অন্যরা কী ভাবছে আর আপনি কী ভাবছেন? নিজের ভাবনাকে চ্যালেঞ্জ করতে শিখুন।
-
নতুন কিছু যোগ করা: প্রতিদিনের একঘেঁয়ে কাজের মধ্যেও নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, “এই স্টোরিটিতে আমি নতুন কী যোগ করতে পারি যা আগে কেউ বলেনি?”
বাস্তব অভিজ্ঞতা: তথ্যের চেয়ে চিন্তাশক্তি বড়
অনেক সময় নতুন পরিবেশে কাজ শুরু করলে মনে হতে পারে আপনার কোনো ‘সোর্স’ বা যোগাযোগ নেই। কিন্তু মৌলিক সাংবাদিকতায় আপনার সাধারণ বুদ্ধিই সবচেয়ে বড় সম্পদ।
নিজের প্রতিক্রিয়া দেখুন
যে কোনো স্টোরি বা ঘটনা নিয়ে আপনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কী ছিল সেটা শুনুন। শুরু করার জন্য কিছুক্ষণের জন্য নিজেকে নিরপেক্ষতা থেকে সরিয়ে নিন। আপনার প্রথম প্রতিক্রিয়া বা প্রথম চিন্তা কী ছিল? অন্যান্যরা কি তাই ভাববে? যখন আপনি আপনার প্রতিক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করবেন, তখন কী হবে? আপনার ভাবনাকে সেটা কোথায় নিয়ে যাবে? আর আপনি প্রতিদিন যেসব জিনিস নিয়ে কাজ করেন সেগুলো নিয়েই প্র্যাকটিস করুন। দেখবেন, হয়তো অন্যান্যরা যেটা দেখতে পারেনি, আপনি সেটাই খুঁজে পাবেন।
বিবিসি নিউজ নাইট-এর মাইকেল ক্রিক বলছেন, ‘এমনকি যখন প্রতিদিনের সাধারণ একঘেঁয়ে প্রযোজনার কাজ করছেন, সব সময় জিজ্ঞেস করুন, আমি কী বলতে পারি যেটা এই স্টোরির জন্য নতুন কিছু হবে?।’
এভাবে চিন্তার প্রক্রিয়া শুরু করার বড় দিক হচ্ছে, আপনাকে কোনো কিছুই জানতে হবে না। শুধু উৎসুক হন আর ভাবুন। একজন সিনিয়র সম্পাদক উত্তর ইংল্যান্ডের এক স্থানীয় রেডিও স্টেশনে তার প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট-এর কথা মনে করে বলেছেন, ‘আমি কিছুই জানতাম না। আমি ওই শহরকে চিনতাম না, আমার কোনো কন্টাক্ট ছিল না, কোথায় শুরু করতে হবে তাও জানতাম না। তখন ইংল্যান্ডের ক্ষমতায় ছিলেন মারগারেট থ্যাচার। তিনি আফগানিস্তানে আক্রমণ চালানোর জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন।’
‘আমার হাতে তখন তেমন কোনো কাজ ছিল না। আমি তখন নিজেকে স্থানীয় একজন ব্যবসায়ীর জায়গায় কল্পনা করলাম। তারপর স্থানীয় এক রফতানিকারক কোম্পানির প্রধান নির্বাহীকে আগাম যোগাযোগ ছাড়াই টেলিফোন করলাম। তিনি ক্ষমতাসীন টোরি দলের স্থানীয় একজন নেতা ছিলেন। সরকারের বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত ছিলেন। তার সাথে সাক্ষাৎকার বিবিসি নিউজ বুলেটিনের লিড স্টোরি হয়ে যায়। সাক্ষাৎকারের ফলোআপ দিয়ে স্থানীয় পত্রিকা এবং আঞ্চলিক টেলিভিশনের প্রধান খবর হয়ে যায়।’
সূত্র: বিবিসি একাডেমি












