গণমাধ্যমের নৈতিক ভিত্তি: একটি সমসাময়িক বিশ্লেষণ
- আপডেট সময় : ১০:৫৬:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 26
সাহিত্য ও সংস্কৃতি মানবজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংস্কৃতির বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে চিত্তবিনোদন আর সংবাদের বিশ্লেষণী অবস্থান। যে অর্থে গণমাধ্যম সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারক, সে অর্থে খবরকে বলা চলে সংস্কৃতির অংশ। তাই গণমাধ্যমে সত্য ও সুন্দর প্রকাশের মধ্য দিয়ে সমাজে যেমন নৈতিকতার ভিত্তি গড়ে ওঠে, তেমনি অন্যায় ও অসত্যের মূলোৎপাটনও হয়। সংবাদপত্রের প্রয়োজন ও শক্তি বিবেচনায় একে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়ে থাকে। একটি দেশের জনগণের রাজনৈতিক চিন্তাধারা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির গতিবিধি অনেকটা সেদেশের গণমাধ্যমের রুচির ওপর নির্ভর করে। আর গণমাধ্যমের রুচি বলতে মূলত ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ এড়িয়ে চলাকে বোঝায়।
যদিও বর্তমান সময়ে সকল মিডিয়া গুটিকয়েক আন্তর্জাতিক মিডিয়ার ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে; তারা তাদের মতো করে হাঁটছে, বলছে ও দেখছে। “সংবাদপত্রের স্বাধীনতা” শীর্ষক কোনো আলোচনা হলে সেখানে মফস্বল সাংবাদিকতাকে বলা যায় একটি জটিল অধ্যায়। “নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো” আর মফস্বলের সাংবাদিকতা আজ একই কথা; সেই সঙ্গে রয়েছে জীবনের ঝুঁকি। মফস্বলে সংবাদের হাত যত লম্বা, বিজ্ঞাপনের হাত ততোটাই খাটো। তাই নিয়মিত কাগজ বের করাই সেখানে বড় চ্যালেঞ্জ।
সংবাদপত্র প্রকাশনার গোড়ার দিকে তাকালে আমরা দেখি, পৃথিবীর প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল চীনে এবং তা ছিল হস্তলিখিত। তবে আধুনিক সংবাদপত্রের জন্ম ও মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার ইউরোপে। উনিশ শতকে সংবাদপত্র হয়ে ওঠে ইউরোপ-আমেরিকার গণজাগরণের হাতিয়ার। একই সঙ্গে তা ছিল বিভিন্ন ভাবাদর্শ ও রাজনৈতিক চিন্তাচেতনার বাহন। ভারতীয় উপমহাদেশেও সংবাদপত্রের সূচনা উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে। ধর্ম, মতাদর্শ ও জনগণের নানারকম সমস্যা-সংকট এবং কর্মকাণ্ড ছিল সংবাদপত্রের উপজীব্য। ইউরোপ বা ভারত-বাংলাদেশ—প্রাথমিক যুগে সংবাদপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছিল না। ঔপনিবেশিক আমলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে সংবাদপত্র হয়ে ওঠে বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক দল ও ধারার মুখপত্র।
সংবাদপত্রের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতার পাশাপাশি জবাবদিহিতার দিকেও নজর রাখা জরুরি। একটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে অন্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অধিকারের প্রতি দৃষ্টি রাখা আবশ্যক। তাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ কখনো কাম্য নয়। তথ্যপ্রযুক্তির এই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে নামে-বেনামে খবরের ছড়াছড়ি। সত্য-মিথ্যা যাচাই করার আগেই তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে।
পৃথিবীর সাম্রাজ্যবাদী শাসকগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেছে। এই সুযোগে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল পৃথিবীর বঞ্চিত ও স্বাধীনতাকামী মানুষকে বিভ্রান্ত করে আসছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনেও বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে মুসলিম বিদ্বেষ ভাইরাল করেছে। রোহিঙ্গাদের ওপর চলা নির্মমতাও আমরা ফেসবুকে পেয়েছি। এক্ষেত্রে ফেসবুক বড় প্রভাবক হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—সংবাদমাধ্যম হিসেবে ফেসবুকে প্রচারিত তথ্যের সত্যতা নিয়ে। মিয়ানমারের জান্তা সরকার আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার নৃশংসতার ছবি জাল করে তা ‘আরাকানে রোহিঙ্গা কর্তৃক সংগঠিত’ বলে প্রচার চালিয়েছে। এতে সেখানে জাতিগত উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, যার পরিণাম আজ সশস্ত্র যুদ্ধে রূপ নিয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে মানুষ পরস্পরের আত্মিক হওয়ার বদলে ভার্চুয়াল বা অশরীরী হয়ে উঠছে। নিউজ মিডিয়াগুলো হয়ে উঠেছে অনলাইন নির্ভর। ঠুনকো অজুহাতে তৈরি হয়েছে ডিজিটাল তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বলয়। সংবাদমাধ্যমে এ এক নতুন শঙ্কার নাম। এখানে সংবাদকর্মীরা অনেকাংশে হয়ে উঠেছেন দর্শকশ্রেণি, আর সংবাদপত্র যেন চোখ বোজা পেঁচার ভূমিকায়। তবুও সত্য ও সুন্দরের সন্ধানে ছুটে চলছেন একদল বিশ্বস্ত সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী। তাঁরা সমাজের অন্যায়-অসংগতির পাশাপাশি দেশের বেগবান অর্থনীতি আর অগ্রগতির নানা ইতিবাচক দিক তুলে ধরছেন।
একটি দেশের জনগণ তাঁদের মত প্রকাশে কতটা স্বাধীন, সেটা সেদেশের সংবাদমাধ্যমের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে দরকার স্বাধীন গণমাধ্যম। এই ধারা বেগবান হয়ে এগিয়ে চলুক আমাদের গণমাধ্যম—এই প্রত্যাশাই রইল।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও উদ্যোক্তা।









