ঢাকা ০৬:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
অ্যাডভোকেট হামিদুল হক ঝন্টুর ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী পালিত নারী উদ্যোক্তাদের হাতে তৈরি সামগ্রীতে প্রাণবন্ত হলিডে মার্কেটের ইফতার মাহফিল ফরিদপুরে বিহারি কলোনিতে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী যুবককে পিটিয়ে হত্যা, আহত মা ও ভাই পবিত্র কোরআনের আলোকে ইসলামে যাকাতের গুরুত্ব ও বিধান বোয়ালমারীতে কিশোর শ্রমিক সজীব হত্যা: আসামি রিহাত মাগুরা থেকে গ্রেপ্তার বেইলি ব্রিজ মেরামতে বিলম্ব: ঈদের আগেই চালুর দাবি ফরিদপুরবাসীর ব্যস্ত সড়কে উপড়ে পড়ল গাছ: অল্পতে বাঁচলেন যাত্রী ফরিদপুরে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান: ১৮টি ইজিবাইকসহ আন্তঃজেলা চোরচক্রের ১২ সদস্য গ্রেপ্তার ফরিদপুরে ‘কাচ্চি সুলতান’কে ১ লাখ টাকা জরিমানা: কিচেনে মিলল ক্ষতিকর কেমিক্যাল বোয়ালমারীতে পায়ুপথে হাওয়া: কিশোর শ্রমিকের মৃত্যু

বিএনপি-জামাতের সাথে লড়াইয়ে স্বতন্ত্ররা; সহিংসতা ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা

বৃহত্তর ফরিদপুরে ভোটের সমীকরণে পাল্টে যাচ্ছে মাঠের হিসাব

বিশেষ প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ০৯:২৬:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / 20

রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬। বৃহত্তর ফরিদপুরের পাঁচ জেলার নির্বাচনের সমীকরণ নিয়ে চলছে নানামুখী হিসাবনিকাশ। এখন পর্যন্ত বড় কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া না গেলেও আওয়ামী লীগের একসময়ের দুর্গ হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন। গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরের মতো জেলাগুলোতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা না থাকায় প্রথমবারের মতো বিএনপি ও জামায়াতের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতা হচ্ছে।

ফরিদপুর: জেলার চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে বিএনপির সাথে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীতায় রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। আরেকটি আসনে বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বীতায় রয়েছেন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাতের্ আঁধারে হামলা, প্রতিপক্ষের সমর্থকদের হাতুড়িপেটার মতো বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও সার্বিক পরিস্থিতি এখনো শান্ত রয়েছে। জেলা সদরের আসনটিতে তুলনামুলক পরিবেশ অনেকটাই শান্ত।

ফরিদপুর১:  ফরিদপুর জেলার চারটি আসনের মধ্যে বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী খন্দকার নাসিরুল ইসলামের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লার ড. আলী ইলিয়াস মোল্যা।

ফরিদপুর২: নগরকান্দা ও সালথা উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মাওলানা শাহ আকরাম আলী।

ফরিদপুর৩: জেলা সদরের আসনটিতে ধানের শীষের চৌধুরী নায়াব ইউসুফ এবং দাঁড়িপাল্লার অধ্যাপক আব্দুত তাওয়াব রয়েছেন মূল লড়াইয়ে। এ আসনে নির্বাচনী পরিবেশ এখন পর্যন্ত শান্ত রয়েছে।

ফরিদপুর৪: ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটি জেলার সবচেয়ে আলোচিত নির্বাচনী রণক্ষেত্র। এখানে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী শহিদুল ইসলামের সামনে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা সরোয়ার হোসেন ছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থী মুজাহিদ বেগ আলোচনায় এসেছেন। সাবেক এমপি নিক্সন চৌধুরীর নানাবিধ গোপন তৎপরতার কারণে এই আসনের সমীকরণ বেশ জটিল হয়ে উঠেছে।

গোপালগঞ্জ: গোপালগঞ্জ জেলার তিনটি আসনে মোট ৩০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে দুটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে এবং একটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সাথে বিএনপি প্রার্থীর মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচনকে ঘিরে গোপালগঞ্জে সহিংসতার আতঙ্ক বিরাজ করছে। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সংবাদ সূত্রের মতে, নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক কম হতে পারে; সব মিলিয়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ভোটার উপস্থিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

গোপালগঞ্জ-১: কাশিয়ানীর একাংশ ও মুকসুদপুর উপজেলা নিয়ে গঠিতে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিম। তাঁর সামনে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল আলম শিমুল ও গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী কাবির মিয়া—যাঁদের দুজনেই বর্তমানে কারাগারে বন্দি।

গোপালগঞ্জ-২: গোপালগঞ্জ জেলা সদর ও কাশিয়ানী উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট প্রার্থী ১৩ জন। এখানে বিএনপির প্রার্থী কে এম বাবর, স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এইচ খান মঞ্জু, স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুজ্জামান ভূইয়া লুটুল এবং ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী সোয়াইব ইব্রাহিমের মধ্যে চতুর্মুখী লড়াই হবে বলে সর্বশেষ খবরে জানা গেছে।

গোপালগঞ্জ-৩:  আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া নিয়ে গঠিত এ আসনে এবারের নির্বাচনে প্রার্থী ৮ জন। এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা এস এম জিলানী এবং হিন্দু মহাজোট ঐক্য পরিষদের নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট গোবিন্দ প্রামাণিক।

রাজবাড়ী: এ অঞ্চলের রাজবাড়ী জেলায় নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এখানে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক ভালো হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

রাজবাড়ী১:  রাজবাড়ী জেলার দুটি আসনের মধ্যে আসনটিতে জেলা সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলা নিয়ে গঠিত। এ আসনে মোট প্রার্থীর সংখ্যা ৪ জন। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী আলী নেওয়াজ খৈয়ম এবং জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম মাঠে সমানতালে দাপটে রয়েছেন। এছাড়াও এখানে জাকের পার্টি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

রাজবাড়ী২: পাংশা, বালিয়াকান্দি ও কালুখালী উপজেলা নিয়ে গঠিতেএ আসনে ৬ জন প্রার্থী রয়েছেন। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী নাসিরুল হক সাবু এবং বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হারুন-অর-রশীদের মধ্যে।

 

মাদারীপুর: মাদারীপুরে ৩টি আসনের দুটিতেই বিদ্রোহীদের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বিএনপি। এই তিনটি আসনে মোট প্রার্থী ২৫ জন। ৩৮১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অধিকাংশকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

মাদারীপুর১: শিবচর উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ আসনে লিটন চৌধুরীর পরিবারের একচ্ছত্র আধিপত্যের মুখে আগে কোনো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হতে পারেনি। তবে ৫ আগস্টের পর এখানে রাজনৈতিক চিত্র বদলে গেছে। হাজী শরীয়তুল্লাহ ও পীর দুদু মিয়ার উত্তরসূরি, ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে ‘রিকশা’ প্রতীকের সাঈদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা ব্যাপক আলোচনায় রয়েছেন। তরুণ ও উদ্যমী এই প্রার্থী এককালের আওয়ামী লীগের এই শক্ত ঘাঁটিতে বেশ মজবুত অবস্থান তৈরি করেছেন। পাশাপাশি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বিএনপির প্রার্থী চৌধুরী নাদিরা আক্তার ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী কামাল জামান। চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা ও মাদক নির্মূল—এবারের নির্বাচনে এ আসনের ভোটারদের কাছে প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মাদারীপুর আসনে বিএনপি প্রার্থী জাহান্দার আলী আকন্দ ও হিন্দু মহাজোটের প্রার্থী মিল্টন বৈদ্যের মধ্যে মূল লড়াই হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তাঁদের সাথে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন খেলাফত মজলিসের মুফতি আব্দুস সোবহান। এই আসনটি আগে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শাজাহান খান পরিবারের আধিপত্যে ছিল।

মাদারীপুর৩: কালকিনি, ডাসার ও মাদারীপুর সদরের একাংশ নিয়ে গঠিত এ আসনের কালকিনি উপজেলায় মোট ৭২টি ভোটকেন্দ্রের সবগুলোই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এখানে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন। এ আসনে বিএনপির কোনো বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী নেই। তবে জেলার অন্য দুটি আসন খেলাফত মজলিসকে ছেড়ে দিলেও এই আসনে নিজেদের প্রার্থী দিয়েছে জামায়াত। ফলে ধানের শীষের সামনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে থাকছেন জামায়াত প্রার্থী রফিকুল ইসলাম।

শরীয়তপুর: শরীয়তপুর জেলায় মোট ৩টি সংসদীয় আসন রয়েছে। এই আসনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৮ জন প্রার্থী। বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং ভোটার উপস্থিতি কম হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শরীয়তপুর১: জাজিরা, শরীয়তপুর সদর ও পালং নিয়ে গঠিত এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বিএনপির সাইদ আহমেদ আসলাম, ১১ দলীয় জোটের মাওলানা জালালউদ্দিন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী কর্নেল রাসেল। এছাড়াও এখানে এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা নির্বাচনে রয়েছেন।

শরীয়তপুর২: নড়িয়া উপজেলা ও সখিপুর থানা নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ৯ জন প্রার্থী রয়েছেন। তবে এখানে মূল লড়াই হবে বিএনপির শফিকুর রহমান কিরণ এবং জামায়াতে ইসলামীর ডা. মাহমুদ হোসেন বকাউলের মধ্যে।

শরীয়তপুর৩: ডামুড্যা, গোসাইরহাট ও ভেদরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনে প্রার্থীর সংখ্যা ৪ জন। এই আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মিয়া নুরুদ্দিন মিয়া অপু এবং জামায়াতের মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।

এদিকে, ভোটের আগে উদ্বেগ বাড়লেও একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ হতে। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ৩ জন সশস্ত্র পুলিশ ও ৩ জন সশস্ত্র আনসারসহ মোট ১৬ জন এবং সাধারণ কেন্দ্রে ১৫ জন করে সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। পুলিশ সদস্যদের বডি-ওর্ন ক্যামেরা এবং ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি করা হবে। মোতায়েন রয়েছে পর্যাপ্ত সেনা সদস্য।

র‌্যাব-১০ ফরিদপুর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার স্কোয়াড্রন লিডার তারিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, নির্বাচন প্রক্রিয়া সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করতে র‌্যাবের টহল কার্যক্রম কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এবারের নির্বাচনে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটতে দেওয়া হবে না। পুরো জেলা জুড়ে র‌্যাবের এই টহল কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। কোনো এলাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে বিশেষ টিম সদা তৎপর রয়েছে।

Tags

বিএনপি-জামাতের সাথে লড়াইয়ে স্বতন্ত্ররা; সহিংসতা ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা

বৃহত্তর ফরিদপুরে ভোটের সমীকরণে পাল্টে যাচ্ছে মাঠের হিসাব

আপডেট সময় : ০৯:২৬:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬। বৃহত্তর ফরিদপুরের পাঁচ জেলার নির্বাচনের সমীকরণ নিয়ে চলছে নানামুখী হিসাবনিকাশ। এখন পর্যন্ত বড় কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া না গেলেও আওয়ামী লীগের একসময়ের দুর্গ হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন। গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরের মতো জেলাগুলোতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা না থাকায় প্রথমবারের মতো বিএনপি ও জামায়াতের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতা হচ্ছে।

ফরিদপুর: জেলার চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে বিএনপির সাথে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীতায় রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। আরেকটি আসনে বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বীতায় রয়েছেন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাতের্ আঁধারে হামলা, প্রতিপক্ষের সমর্থকদের হাতুড়িপেটার মতো বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও সার্বিক পরিস্থিতি এখনো শান্ত রয়েছে। জেলা সদরের আসনটিতে তুলনামুলক পরিবেশ অনেকটাই শান্ত।

ফরিদপুর১:  ফরিদপুর জেলার চারটি আসনের মধ্যে বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী খন্দকার নাসিরুল ইসলামের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লার ড. আলী ইলিয়াস মোল্যা।

ফরিদপুর২: নগরকান্দা ও সালথা উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মাওলানা শাহ আকরাম আলী।

ফরিদপুর৩: জেলা সদরের আসনটিতে ধানের শীষের চৌধুরী নায়াব ইউসুফ এবং দাঁড়িপাল্লার অধ্যাপক আব্দুত তাওয়াব রয়েছেন মূল লড়াইয়ে। এ আসনে নির্বাচনী পরিবেশ এখন পর্যন্ত শান্ত রয়েছে।

ফরিদপুর৪: ভাঙ্গা, সদরপুর ও চরভদ্রাসন উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটি জেলার সবচেয়ে আলোচিত নির্বাচনী রণক্ষেত্র। এখানে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী শহিদুল ইসলামের সামনে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা সরোয়ার হোসেন ছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থী মুজাহিদ বেগ আলোচনায় এসেছেন। সাবেক এমপি নিক্সন চৌধুরীর নানাবিধ গোপন তৎপরতার কারণে এই আসনের সমীকরণ বেশ জটিল হয়ে উঠেছে।

গোপালগঞ্জ: গোপালগঞ্জ জেলার তিনটি আসনে মোট ৩০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে দুটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে এবং একটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সাথে বিএনপি প্রার্থীর মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচনকে ঘিরে গোপালগঞ্জে সহিংসতার আতঙ্ক বিরাজ করছে। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সংবাদ সূত্রের মতে, নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক কম হতে পারে; সব মিলিয়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ভোটার উপস্থিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

গোপালগঞ্জ-১: কাশিয়ানীর একাংশ ও মুকসুদপুর উপজেলা নিয়ে গঠিতে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিম। তাঁর সামনে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আশরাফুল আলম শিমুল ও গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী কাবির মিয়া—যাঁদের দুজনেই বর্তমানে কারাগারে বন্দি।

গোপালগঞ্জ-২: গোপালগঞ্জ জেলা সদর ও কাশিয়ানী উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট প্রার্থী ১৩ জন। এখানে বিএনপির প্রার্থী কে এম বাবর, স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এইচ খান মঞ্জু, স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুজ্জামান ভূইয়া লুটুল এবং ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী সোয়াইব ইব্রাহিমের মধ্যে চতুর্মুখী লড়াই হবে বলে সর্বশেষ খবরে জানা গেছে।

গোপালগঞ্জ-৩:  আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া নিয়ে গঠিত এ আসনে এবারের নির্বাচনে প্রার্থী ৮ জন। এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা এস এম জিলানী এবং হিন্দু মহাজোট ঐক্য পরিষদের নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট গোবিন্দ প্রামাণিক।

রাজবাড়ী: এ অঞ্চলের রাজবাড়ী জেলায় নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এখানে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক ভালো হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

রাজবাড়ী১:  রাজবাড়ী জেলার দুটি আসনের মধ্যে আসনটিতে জেলা সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলা নিয়ে গঠিত। এ আসনে মোট প্রার্থীর সংখ্যা ৪ জন। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী আলী নেওয়াজ খৈয়ম এবং জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম মাঠে সমানতালে দাপটে রয়েছেন। এছাড়াও এখানে জাকের পার্টি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

রাজবাড়ী২: পাংশা, বালিয়াকান্দি ও কালুখালী উপজেলা নিয়ে গঠিতেএ আসনে ৬ জন প্রার্থী রয়েছেন। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী নাসিরুল হক সাবু এবং বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হারুন-অর-রশীদের মধ্যে।

 

মাদারীপুর: মাদারীপুরে ৩টি আসনের দুটিতেই বিদ্রোহীদের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বিএনপি। এই তিনটি আসনে মোট প্রার্থী ২৫ জন। ৩৮১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অধিকাংশকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

মাদারীপুর১: শিবচর উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ আসনে লিটন চৌধুরীর পরিবারের একচ্ছত্র আধিপত্যের মুখে আগে কোনো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হতে পারেনি। তবে ৫ আগস্টের পর এখানে রাজনৈতিক চিত্র বদলে গেছে। হাজী শরীয়তুল্লাহ ও পীর দুদু মিয়ার উত্তরসূরি, ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে ‘রিকশা’ প্রতীকের সাঈদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা ব্যাপক আলোচনায় রয়েছেন। তরুণ ও উদ্যমী এই প্রার্থী এককালের আওয়ামী লীগের এই শক্ত ঘাঁটিতে বেশ মজবুত অবস্থান তৈরি করেছেন। পাশাপাশি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বিএনপির প্রার্থী চৌধুরী নাদিরা আক্তার ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী কামাল জামান। চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা ও মাদক নির্মূল—এবারের নির্বাচনে এ আসনের ভোটারদের কাছে প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মাদারীপুর আসনে বিএনপি প্রার্থী জাহান্দার আলী আকন্দ ও হিন্দু মহাজোটের প্রার্থী মিল্টন বৈদ্যের মধ্যে মূল লড়াই হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তাঁদের সাথে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন খেলাফত মজলিসের মুফতি আব্দুস সোবহান। এই আসনটি আগে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শাজাহান খান পরিবারের আধিপত্যে ছিল।

মাদারীপুর৩: কালকিনি, ডাসার ও মাদারীপুর সদরের একাংশ নিয়ে গঠিত এ আসনের কালকিনি উপজেলায় মোট ৭২টি ভোটকেন্দ্রের সবগুলোই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এখানে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন। এ আসনে বিএনপির কোনো বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী নেই। তবে জেলার অন্য দুটি আসন খেলাফত মজলিসকে ছেড়ে দিলেও এই আসনে নিজেদের প্রার্থী দিয়েছে জামায়াত। ফলে ধানের শীষের সামনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে থাকছেন জামায়াত প্রার্থী রফিকুল ইসলাম।

শরীয়তপুর: শরীয়তপুর জেলায় মোট ৩টি সংসদীয় আসন রয়েছে। এই আসনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৮ জন প্রার্থী। বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং ভোটার উপস্থিতি কম হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শরীয়তপুর১: জাজিরা, শরীয়তপুর সদর ও পালং নিয়ে গঠিত এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বিএনপির সাইদ আহমেদ আসলাম, ১১ দলীয় জোটের মাওলানা জালালউদ্দিন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী কর্নেল রাসেল। এছাড়াও এখানে এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা নির্বাচনে রয়েছেন।

শরীয়তপুর২: নড়িয়া উপজেলা ও সখিপুর থানা নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ৯ জন প্রার্থী রয়েছেন। তবে এখানে মূল লড়াই হবে বিএনপির শফিকুর রহমান কিরণ এবং জামায়াতে ইসলামীর ডা. মাহমুদ হোসেন বকাউলের মধ্যে।

শরীয়তপুর৩: ডামুড্যা, গোসাইরহাট ও ভেদরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনে প্রার্থীর সংখ্যা ৪ জন। এই আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মিয়া নুরুদ্দিন মিয়া অপু এবং জামায়াতের মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।

এদিকে, ভোটের আগে উদ্বেগ বাড়লেও একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ হতে। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ৩ জন সশস্ত্র পুলিশ ও ৩ জন সশস্ত্র আনসারসহ মোট ১৬ জন এবং সাধারণ কেন্দ্রে ১৫ জন করে সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। পুলিশ সদস্যদের বডি-ওর্ন ক্যামেরা এবং ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি করা হবে। মোতায়েন রয়েছে পর্যাপ্ত সেনা সদস্য।

র‌্যাব-১০ ফরিদপুর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার স্কোয়াড্রন লিডার তারিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, নির্বাচন প্রক্রিয়া সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করতে র‌্যাবের টহল কার্যক্রম কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এবারের নির্বাচনে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটতে দেওয়া হবে না। পুরো জেলা জুড়ে র‌্যাবের এই টহল কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। কোনো এলাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে বিশেষ টিম সদা তৎপর রয়েছে।